ড্রাগন ফল ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর ফল। দেশে এর চাষ ও বাজারচাহিদা বাড়ছে। ছাদ কৃষি থেকে মাঠপর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফল চাষের সুযোগও রয়েছে। সঠিক জাত নির্বাচন, চারা তৈরি, রোপণ, খুঁটি স্থাপন, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগ-পোকা দমন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকলে এ চাষে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। এ বিষয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘রানার কৃষি’তে পরামর্শ দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।
ড্রাগন ফল এক ধরনের ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ। পুষ্টিগুণ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে ফলটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশে উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
উপযুক্ত জলবায়ু ও মাটি
ড্রাগন ফল উষ্ণ জলবায়ুর ফসল। সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এ ফল চাষের জন্য উপযোগী। অতিরিক্ত ঠান্ডা ও তুষারপাত গাছের জন্য ক্ষতিকর। বেলে দোআঁশ ও দোআঁশ মাটিতে ড্রাগন ফল ভালো জন্মে। মাটির পিএইচ ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ হলে তা চাষের জন্য উপযোগী।
আমাদের দেশে বর্তমানে বাউ ড্রাগন ফল-১ ও বাউ ড্রাগন ফল-২ জাত চাষ করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক বাগান স্থাপনের ক্ষেত্রে এলাকার আবহাওয়া, মাটির ধরন ও বাজারচাহিদা বিবেচনা করে উপযুক্ত জাত নির্বাচন করা প্রয়োজন।
চারা তৈরি ও রোপণ
সাধারণত কাণ্ডের ডাল বা কাটিংয়ের মাধ্যমে ড্রাগন ফলের চারা তৈরি করা হয়। সুস্থ ও রোগমুক্ত গাছ থেকে ৮–১০ ইঞ্চি লম্বা কাটিং সংগ্রহ করতে হবে। কাটিং সংগ্রহের পর প্রায় সাতদিন ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে শুকিয়ে নিতে হয়। এতে কাটিংয়ের কাটা অংশ শুকিয়ে যায় এবং রোপণের পর পচনের ঝুঁকি কমে।
মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত ড্রাগন ফলের চারা রোপণ করা যায়। জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। এরপর প্রায় ২ ফুট চওড়া ও ২ ফুট গভীর গর্ত তৈরি করতে হবে।
চারা রোপণের আগে প্রতিটি গর্তে ১০–১৫ কেজি গোবর সার, ২০০ গ্রাম টিএসপি ও ১৫০ গ্রাম এমওপি প্রয়োগ করা যেতে পারে। জমিতে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা থাকলে গর্তের নিচে বালু ব্যবহার করা যেতে পারে।
খুঁটি স্থাপন ও চারা লাগানো
ড্রাগন ফল গাছ লতানো প্রকৃতির হওয়ায় গাছকে ভর দেওয়ার জন্য শক্ত খুঁটি প্রয়োজন। এজন্য ৪ ইঞ্চি বাই ৩ ইঞ্চি বেড়ের ৮ থেকে ১০ ফুট লম্বা আরসিসি খুঁটি ব্যবহার করা যায়। খুঁটির প্রায় দেড় ফুট মাটির নিচে রেখে ভালোভাবে বসিয়ে দিতে হবে।
খুঁটির মাথায় টায়ার অথবা ১ থেকে ১ দশমিক ৫ ফুট ব্যাসের বৃত্তাকার রডের কাঠামো তৈরি করতে হয়। প্রতিটি খুঁটির চারপাশে চারটি করে কাটিং রোপণ করা যায়। তবে কাটিংয়ের গোড়া ৩ থেকে ৪ ইঞ্চির বেশি মাটির নিচে দেওয়া যাবে না। রোপণের পর চারাগুলোকে আলতোভাবে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে।
সঠিক পরিচর্যা ও অনুকূল পরিবেশ পেলে রোপণের প্রায় ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে গাছে ফল আসতে পারে। তবে ফলন ও উৎপাদনকাল জাত, পরিবেশ, পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।
রোগবালাই ও পোকামাকড়
ড্রাগন ফলের বাগানে অ্যানথ্রাকনোজ, গোড়াপচা, কাণ্ডপচা ও কাণ্ডের ক্যানকার জাতীয় রোগ দেখা দিতে পারে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আক্রান্ত অংশ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগ নিয়ন্ত্রণে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় ও সঠিক সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।
বাগানে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে গোড়া ও কাণ্ড পচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং গাছের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
ড্রাগন ফলে থ্রিপস, মিলিবাগ ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত গাছ ও ফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পোকার আক্রমণ হলে নিমতেল ব্যবহার করা যেতে পারে। আক্রমণ বেশি হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
পরিচর্যায় গুরুত্ব
ড্রাগন ফলের ভালো ফলনের জন্য শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না; নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ও পানি নিষ্কাশন, রোগ-পোকা পর্যবেক্ষণ এবং গাছের বাড়তি শাখা-প্রশাখা ব্যবস্থাপনা করতে হবে। গাছ যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। ড্রাগন ফল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। তাই বাড়ির ছাদ, বসতভিটা কিংবা উপযুক্ত কৃষিজমিতে পরিকল্পিতভাবে ড্রাগন ফলের চাষ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলে কৃষকের জন্য নতুন আয়ের ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।


























