সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬

৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বেচ্ছাশ্রমে সরকারি দায়িত্ব পালনে লাখ টাকা খরচ 

রানার প্র‌তি‌বেদক

প্রকাশিত: ১২:৫০, ২৩ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৩:৫৭, ২৩ আগস্ট ২০২৬

স্বেচ্ছাশ্রমে সরকারি দায়িত্ব পালনে লাখ টাকা খরচ 

একজন সাব-রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সী। যিনি মূল দায়িত্বে আছেন ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের। কিন্তু দেশে সাব-রেজিস্ট্রার পদের স্বল্পতার সুযোগে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন- যশোরের মণিরামপুর ও শার্শা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার পদে। সপ্তাহের প্রতি রোববার ও সোমবার তিনি মণিরামপুরে, মঙ্গলবার ও বুধবার শার্শায় এবং বৃহস্পতিবার অফিস করেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে। 

পৈতৃক সূত্রে নড়াইল সদর উপজেলার বাসিন্দা রিপন মুন্সী ইতঃপূর্বে ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ‘হেড ক্লার্ক’ পদে চাকরি সুবাদে ওখানেই জমি কিনে আবাস গড়েছেন। মূলত ওই বাড়িতেই পরিবারের সাথে বসবাস করেন তিনি। আর কর্মস্থলের কারণে কালীগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের বিপরীত পাশে একটি বাসা ভাড়া নেওয়া আছে। 

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে- প্রতি রোববার সকালে বিলাসবহুল একটি প্রাইভেটকার যোগে ফরিদপুর থেকে তিনি মণিরামপুর আসেন। সেখানে অফিস শেষ করে যশোর শহরের অভিজাত একটি আবাসিক হোটেলে রাত্রিযাপন করেন। পরদিন সোমবার সকালে প্রাইভেটকারযোগে আবার যান মণিরামপুরে। সেখানে অফিস শেষ করে আবার যশোর শহরে ফিরে ওই আবাসিক হোটেলে রাত্রিযাপন করেন, আবার মাঝে-মধ্যে কালীগঞ্জের ভাড়া বাসায় কিংবা সাবেক কর্মস্থল বাঘারপাড়া সাব-রেজিস্ট্র অফিসের একজন ওমেদারের (নাইটগার্ড) বাঘারপাড়ার বাসায় বেড়াতে যান। এরপর মঙ্গলবার সকালে প্রাইভেটকারযোগে যান শার্শায়। সারাদিন অফিস করে থাকেন কোন হোটেলে। এরপর বুধবার শার্শাতে অফিস শেষ করে প্রাইভেটকার যোগে পৌঁছান কালীগঞ্জের ভাড়া বাসায়। সেখানে রাত্রিযাপন করে বৃহস্পতিবার সারাদিন কালীগঞ্জে অফিস শেষ করে প্রাইভেটকার যোগে চলে যান ফরিদপুরের নিজ বাসভবনে, তবে কখনো-কখনো বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করতে বেশি রাত হলে শুক্রবার সকালে যান ফরিদপুরে। সপ্তাহের প্রতিটি দিন এভাবেই চলছে দীর্ঘদিন। তবে কোন ক্লান্তি নেই, এক অফিস থেকে আরেক অফিসের দীর্ঘ দূরত্বে এ অফিস যাত্রার প্রকৃত যাতায়াত ব্যয়ের তুলনায় ‘যৎসামান্য’ টিএডিএ বিলের সরকারি বরাদ্দ থাকলেও তিনি এ বাবদ টাকা নেন না। একইসাথে বড় অংকের হোটেল ভাড়া ও বাসার ভাড়ার অর্থ গুণতে হচ্ছে। সব মিলে প্রতিমাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় লক্ষাধিক টাকা। যা সাব-রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সীর সরকারি বেতনের চেয়েও বেশি। ফলে প্রতীয়মান হতেই পারে- সরকারি দায়িত্ব পালনে পকেট থেকে বিপুল অংকের অর্থ খরচ হলেও এতে কেন নেই অভিযোগ? প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত টাকা খরচ করে এভাবেই ‘খুশি মনে’ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন রিপন মুন্সি। সবকিছু রূপকথার গল্পের মতো মনে হওয়ায় এ ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে অফিসগুলোতে নজর রাখে এ প্রতিবেদক। 
অনুসন্ধানের শুরুতেই গত রোববার ও সোমবার মণিরামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কম্পাউন্ড ও স্থানীয় দলিল লেখক কার্যালয়ে আগত সেবা গ্রহীতাদের সাথে পরিচয় গোপন করে কথা বলতেই পকেট থেকে লাখ টাকা খরচ করে স্বেচ্ছাশ্রমে সরকারি দায়িত্ব পালন করার রহস্যের জট খুলতে শুরু করে। 

মণিরামপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে আসা সেবাগ্রহীতাদের সাথে কথা বলে স্পষ্ট হওয়া গেলো- এখানে ঘুষের লেনদেন ‘ওপেন সিক্রেট’। এমনকি, গ্রহীতারা জমি রেজিস্ট্রি করতে আসার আগেই সরকারি ফিসের বাইরে আরও বড় অংকের টাকা ঘুষ দিতে হবে সেটা জেনে-বুঝে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন। 
দলিল লেখক সমিতি কম্পাউন্ডের পাশের একটি খাবার হোটেলে বসে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মান্নান গাজীর। 
তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছোট ভাই প্রবাসে থাকেন। তার পাঠানো টাকায় ভাইপো (ভাতিজা) জমি কিনেছে। ওই জমি আজ রোববার রেজিস্ট্রি হবে। কিন্তু ভাতিজা ভালো বুঝবে না বলেই পরিবারের শিক্ষিত মুরব্বি হিসেবে আমাকে নিয়ে এসেছে।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘রেজিস্ট্রি অফিসে এসে বুঝলাম, এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে বোঝা-না বোঝার কিছু নেই। যা হচ্ছে- সবই ‘প্রকাশ্য ঘুষের’ বিনিময়ে। ঘুষ না দিলে ‘মার-প্যাচের’ শেষ নেই। এসব জেনে-বুঝে নীরবে ‘ঘুষ বাণিজ্যকে’ স্বাভাবিক হিসেবেই মেনে নিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৫ লাখ টাকা মূল্যের জমি রেজিস্ট্রিতে সরকারি ফিস ও লেখকের ফিসের বাইরে ‘সাব রেজিস্ট্রারের ঘুষ, কর্মচারীদের ঘুষ ও দলিল লেখক সমিতির নামে অবৈধ চাঁদা’ মিলে অতিরিক্ত খরচ হলো প্রায় ২০ হাজার টাকা।’ 

বিধান চন্দ্র নামের একজন ভুক্তভোগী জানালেন, তার বাবা মৃত্যুবরণ করেছেন। বর্তমানে হিন্দু সম্পত্তি আইনে ছেলের পাশাপাশি মা উত্তরাধিকার হওয়ায় ওই সম্পত্তিকে অবহিত করা হয় ‘জীবনী স্বত্ত্ব’ নামে। তবে পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রি করার প্রয়োজন হলেও পড়েন রেজিস্ট্রি জটিলতায়। 
তিনি বলেন, ‘প্রথমে মায়ের সম্পত্তি রেজিস্ট্রি হবে না জানালেও লেখকের মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার ঘুষ নিয়ে ঠিকই কাজটা করতে রাজি হয়েছেন। এতে জমির ক্রেতা ঘুষের টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় বিপদে পড়ে জমি বিক্রির স্বার্থে ওই অতিরিক্ত টাকা আমাকেই দিতে হলো।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মণিরামপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও প্রতিটি রেজিস্ট্রির সময় দলিলে উল্লেখিত জমির দরের উপর প্রতি লাখে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা ঘুষ নেন সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সী। তবে অনেক বেশি অংকের জমির ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ৭০০ টাকা হারে ঘুষ নেন। তবে রেজিস্ট্রির সময় দাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের বানানের সাথে পর্চার বানানের করনীক ভুল, ওয়ারিশ সম্পত্তি রেজিস্ট্রি, হিন্দু আইনের জীবনী স্বত্ত্ব সম্পত্তি রেজিস্ট্রি, বিল শ্রেণির জমি রেজিস্ট্রি, সরকারি ফিস ফাঁকি দিতে জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা স্থাপনা থাকা বাণিজ্যিক জমিকে ডাঙ্গা বা ধানী দেখিয়ে রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রার নিজ খাসকামরায় বসে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকের সাথে ‘দরাদরি’ করে ঘুষের পরিমাণ নির্ধারণ করেন। এসব বিভিন্ন খাতওয়ারি ঘুষের টাকা আদায়ের জন্য একাধিক কর্মচারীকে দায়িত্ব দিয়েছেন সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সী। এরমধ্যে অফিসের বড়বাবু অসিম চক্রবর্তী, ইলিয়াস হোসেন লিপন ও টিসি মোহরার প্রবীর চন্দ্র ঘুষের অধিকাংশ টাকা লেনদেন করেন। যদিও, এ বিষয়ে ইলিয়াস হোসেন লিপন ঘুষ লেনদেন নিজের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে বলেন, ‘আমি ‘ঘুষ’ লেনদেনের মধ্যে থাকি না। কেউ হয়তো মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন।’


নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে স্থানীয় একজন দলিল লেখক বললেন, ‘নিউজ লিখলে শুধু শুধু আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হবো, অফিসারের কিছু হবে না।’ তাঁর মতে, ইতোপূর্বে একজন ভারতীয় নাগরিক দেশে এসে একটি জন্ম নিবন্ধন তৈরি করেই সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সীকে ঘুষ দিয়ে সম্পত্তি গ্রহীতার নামে দলিল করে দিয়ে গেছেন। এনিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। এতে কি কিছু হয়েছে? হবে না, কারণ, সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত ঘুষের ভাগ যায়। 
এদিকে, আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সীর অন্য দুই কর্মস্থল যশোরের শার্শা ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে একাধিক ভুক্তভোগী, দলিল লেখকসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এতে স্পষ্ট হয়, সব অফিসেই রিপন মুন্সী একইভাবে অর্থ আদায় করেন। তবে অফিস ও দলিলের প্রকারভেদে ঘুষের রেট ভিন্ন। এরমধ্যে শার্শায় প্রত্যেক দলিলে উল্লেখিত জমির দামের উপর প্রতি হাজারে ৫-৬ টাকা অর্থাৎ প্রতি লাখে ৫০০-৬০০ টাকা এবং দলিল লেখক সমিতির নামে আদায়কৃত চাঁদার ২৫ শতাংশ টাকা ঘুষ পান সাব-রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সী। এই অফিসের ঘুষের টাকা আদায়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন অফিসের মোহরার আব্দুল আলিম ও সেলিম হোসেন। 
এদিকে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কয়েকজন কর্মচারী ও বহিরাগতকে নিয়ে ঘুষ আদায় সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও আছে সাব-রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সীর বিরুদ্ধে। 
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের টাকা আদায়কারী হিসেবে নকলনবিশ সাহেব আলী, মোহরার সবুজ হোসেন, টিসি মোহরার নাজমা খাতুন, নিরাপত্তা প্রহরী রাকিব হোসেন ও বহিরাগত ওমেদার শাকিল হোসেনের নাম এসেছে। 

একাধিক সূত্রের দাবি, ঘুষের আদায়ের অর্থের পরিমাণ বেশি হলে সহযোগীদের মাধ্যমে তা সরিয়ে রাখা হয়। অফিসের রেকর্ড রুম, বারান্দা এবং কম্পিউটার কক্ষের বিভিন্ন স্থানে টাকা রাখা হয়। অফিস শেষে টাকা অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। তবে প্রত্যেক অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও ঘুষ লেনদেনের কয়েকটি স্থান ক্যামেরার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো ক্যামেরা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখার হয়েছে। 
জানা গেছে সর্বশেষ গত সপ্তাহে মণিরামপুরে প্রায় ৩০০টি, প্রায় ৫০০ টি এবং কালীগঞ্জে ১৭০ টি মিলে এক সপ্তাহে তিনি তিনটি অফিস প্রায় ১ হাজার দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। এতে ‘স্বাভাবিক দলিল ও  ফাঁকফোঁকরের’ দলিল মিলে কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করেছেন। প্রতি মাসের হিসেবে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা ঘুষবাণিজ্য করছেন। 
তবে এনিয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি রিপন মুন্সীর। একাধিকবার তার অফিসে গেলে সময়ের অভাবে তিনি বক্তব্য দিতে পারেননি। আর মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া মেসেজ করলেও কোন উত্তর আসেনি। 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: