মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবতাবিরোধী ‘অপরাধ

কাদের, সাদ্দাম, ইনানসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে রায়ের অপেক্ষা

রানার ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:২৮, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১২:৩৩, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাদের, সাদ্দাম, ইনানসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে রায়ের অপেক্ষা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামি দোষী সাব্যস্ত হবেন কি না এবং হলে কী সাজা হবে, তা আজ জানা যাবে।

সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটির রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

সাত আসামির সবাইকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার চলে।

রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক

গত ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। রাষ্ট্রপক্ষে আরও ছিলেন কৌঁসুলি মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামীম।

আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হওয়ায় আইনি বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। পলাতক আসামিদের পক্ষে লড়েন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইশরাত জাহান।

ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে এম হাসান ইমাম দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর মক্কেলরা কোনো ‘কমান্ডিং পজিশনে’ ছিলেন না।

অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনে তাঁর মক্কেলদের নাম আসেনি এবং তাঁরা অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত চলা বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না এবং ভিডিওতে আসামিদের হাতে লাঠিসোঁটা থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি—এমন দাবি তুলে ধরে তিনি চার আসামির খালাস চান।

অভিযোগ গঠন থেকে রায়

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। সেদিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাক জবানবন্দি দেন। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সবশেষ ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে। পরে সোমবার ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার দিন ঠিক করে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচার চলছে।

ইতোমধ্যে দুই ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে। এসব রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১১ জন পলাতক এবং চারজন কারাবন্দি রয়েছেন।

সবার বিরুদ্ধে অভিন্ন ধারা ও অভিযোগ

সাত আসামির বিরুদ্ধেই ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সম্পৃক্ততায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়।

অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাতজনকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), (গ), (হ) এবং ৪(১), (২), (৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

ওবায়দুল কাদের: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?”

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি।

আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট ধীর করা, পুলিশ-র‌্যাবকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে ফোনালাপেও আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম: অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ৯ ও ১৫ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে বসে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ ও প্ররোচনা দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের বিষয়টি তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করতেন এবং তাঁর নির্দেশে সেখানে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে।

৪ আগস্ট ফার্মগেটে আন্দোলনকারীদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাহাউদ্দিন নাছিমের প্ররোচনায় নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-৮-এ সশস্ত্র হামলায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটে।

মোহাম্মদ আলী আরাফাত: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৩ ও ১৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।

১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে মহড়া দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা-১৭ আসনের মহাখালী ও গুলশান এলাকায় হামলা চালিয়ে একাধিক আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়া আন্দোলন দমনে সরকারের বল প্রয়োগের খবর প্রচার করায় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

শেখ ফজলে শামস পরশ: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, যুবলীগ চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলে শামস পরশ তাঁর অধীনস্থ নেতাকর্মীদের ‘সশস্ত্র অবস্থায়’ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তাঁর নির্দেশ ও নেতৃত্বে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলন চলাকালে হামলা চালায়।

১৮ জুলাই সারা দেশে গুলিতে অন্তত ২৩ জন নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হওয়ার কথাও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

পরশের বিরুদ্ধে ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মাইনুল হোসেন খান নিখিল: অভিযোগপত্র অনুযায়ী, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১২ জুলাই সিলেটে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দিয়ে যুবলীগ নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় অংশ নেওয়া এবং ১৯ জুলাই মিরপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিখিলের সরাসরি নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।

সাদ্দাম হোসেন: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি দেন।

ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১১ জুলাই বিকালে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাদ্দামের ফোনালাপ হয় এবং সেখানে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া এবং আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দামের বক্তব্যের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান: অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’-এর নামে আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় হেলমেট পরা অবস্থায় মাঠে থেকে তা সরাসরি তদারকি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আল জাজিরায় ফাঁস হওয়া কথোপকথনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে তা সারাদেশে বাস্তবায়নের বিষয়টি উঠে আসে।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: