শনিবার ০৩ অক্টোবর ২০২৬

১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উন্নয়নের ধীরগতিতে কমছে সরকারের ব্যাংক ঋণ

​​​​​​​ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২০:৫১, ২ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২০:৫৫, ২ অক্টোবর ২০২৬

উন্নয়নের ধীরগতিতে কমছে সরকারের ব্যাংক ঋণ

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর চেষ্টায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার গতি কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা, আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে নিট ঋণ কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ না নিয়ে আগের ঋণের ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। অন্যদিকে একই সময়ে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং জ্বালানি ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কারণে সামনে সরকারের ঋণ ও মূল্যস্ফীতি—দুই চাপই বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগের নেওয়া ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা নেওয়া হয়।

অন্যদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এটি মোট এডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের এই হার সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা

চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রথম দুই মাসেই এই লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ নেওয়া হয়েছে।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হলেও বছর শেষে সরকার ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঋণ নেওয়া হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। জুনের শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরকারের ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণের স্থিতি জুনের ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা থেকে কমে আগস্টে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও এখনও ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও বাড়ছে। এতে পরিবহন, উৎপাদন ও সরকারি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘প্রতিবারই অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ে। রাজস্ব আদায় কম হয়। প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে বেশি ঋণ নিতে হয়। এবারও তাই হয়েছিল; এখন কিন্তু কমে আসছে। আবার বাড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত কিংবা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এটা ভালো যে, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করছে। এতে মূল্যস্ফীতিতে হয়তো চাপ কমবে। কিন্তু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কারণে সরকারের খরচ বাড়বে; মূল্যস্ফীতিও বাড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তেমন পদক্ষেপ নেই। ফলে সামনে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে, ঋণও বাড়বে।’

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: