শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২৬

৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভিযোগের ভিত্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

​​​​​​​ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২১:১৭, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২১:৪০, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

অভিযোগের ভিত্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামের মধ্যে আঁতাতের মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর দাবি, সরকারের কাছে এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ দিয়ে দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি অভিযোগের পক্ষে অবস্থান নিলেও জামায়াতে ইসলামী তা প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সম্প্রতি রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কয়েকটি স্থানে ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে। আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করছে।’ এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ অতীতের রাজনৈতিক সমঝোতা ও যৌথ আন্দোলনের নজির তুলে ধরে অভিযোগটিকে একেবারে উড়িয়ে দিতে নারাজ। অন্যদিকে, জামায়াতের নেতারা অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কয়েকটি দলের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন।

অতীতের রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বলেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কীসের ভিত্তিতে ইঙ্গিত করেছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে রাজনৈতিক স্বার্থে দুই দলের মধ্যে বোঝাপড়া থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অতীতে তারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছে উল্লেখ করে রতন বলেন, ‘রাজনৈতিক স্বার্থে এই দুই দলের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া সব সময়ই ছিল।’ তবে রাজনৈতিক দলের ওপর গোয়েন্দা নজরদারির বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নজরদারি দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।’

বিএনপির বক্তব্য, অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের উন্নয়নে কাজ করছেন। কিন্তু বিরোধী দল বিভিন্ন স্থানে হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’

সেলিমা রহমানের ভাষ্য, ‘ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারাও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। দুই পক্ষের কর্মকাণ্ডে সাদৃশ্য রয়েছে।’ তবে বিরোধী দল স্বৈরাচারের ফাঁদে পা দিলে নিজেরাও বিপদে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অভিযোগের ভিত্তি ও পদক্ষেপ জানতে চায় ইসলামী আন্দোলন

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের আঁতাতের অভিযোগ উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকার দাবি করা হলে শুধু জনসভায় বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে হয়।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণ কী।’

গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাই ষড়যন্ত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন বিরোধীদের

প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের নেতারাও। তাঁদের বক্তব্য, সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকলে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ও মিছিল কীভাবে হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। তাঁরা গোয়েন্দা তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সত্য হলে গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’ আর অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি না থাকলে এমন স্পর্শকাতর বক্তব্য দেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জামায়াতের অভিযোগ, বিরোধী আন্দোলন বিতর্কিত করার চেষ্টা

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহছানুল মাহবুব জুবায়ের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের যৌক্তিক আন্দোলনকে বিতর্কিত করতেই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘বিএনপি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা গুলশানে আওয়ামী লীগের বড় ধরনের শোডাউন হলেও তারা বাধার মুখে পড়েনি। এর কারণ প্রশাসনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অবস্থান রয়েছে।’

জুবায়ের বলেন, সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এ ধরনের আচরণ অব্যাহত থাকলে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে মূল্য দিতে হতে পারে।’

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: