পৌষের মিষ্টি রোদ আর কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে গাছিদের ব্যস্ততা জানান দেয়—শুরু হয়েছে শীতের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী আমেজ। বাঙালির শীতকালীন সকাল মানেই ভাপা পিঠা আর পাটালি গুড়ের সুবাস। আর এই ঐতিহ্যের মুকুটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘খেজুর গুড়’। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (এও) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এবার আরও বড় পরিসরে শুরু হলো গুড় সংগ্রহের মৌসুম।
সোমবার জেলার চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের হায়াতপুর গ্রামে এক অনাড়ম্ভর গাছি সমাবেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এই রস সংগ্রহের কর্মযজ্ঞ। মাঠপর্যায়ের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যেন জানান দিচ্ছে, বাংলার এই গ্রামীণ ঐতিহ্য এখন কেবল স্থানীয় চাহিদাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর অর্থনৈতিক পরিধি ছড়িয়ে পড়ছে বহুদূর পর্যন্ত।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চৌগাছা উপজেলাতেই ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩০ হাজার গাছ থেকে নিয়মিত রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। হিসাব কষে দেখা যায়, একটি পরিপক্ক খেজুর গাছ থেকে পুরো মৌসুমে গড়ে প্রায় ৮০ লিটার রস পাওয়া যায়, যা থেকে প্রায় ১০ কেজি সুস্বাদু গুড় উৎপাদন করা সম্ভব।
এই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে কেবল চৌগাছা উপজেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৯ কোটি টাকার খেজুর গুড় উৎপাদিত হয়। আর পুরো যশোর জেলাজুড়ে চলতি মৌসুমে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার খেজুর গুড় উৎপাদনের বড় লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি যশোর জেলা ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ আশেক হাসান যখন জানান যে প্রধানমন্ত্রী নিজেই চৌগাছার খেজুর গুড় উৎপাদনের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন, তখন উপস্থিত গাছি ও স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। কৃষিমন্ত্রী চৌগাছা উপজেলাকে ‘বিশেষ কৃষি অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করায় এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় চমক হলো—এবার আর শুধু দেশের গণ্ডিতেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছে যেতে পারে যশোরের এই গুড়। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, একজন উদ্দীপ্ত উদ্যোক্তা খেজুরের রস থেকে বিশেষ ‘সিরাপ’ তৈরি করে চলতি মৌসুমেই তা বিদেশে রপ্তানির যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকারও চলতি মৌসুম থেকে খেজুর গুড় বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আশ্বাস দিয়েছে।
গুড় উৎপাদন বাড়াতে এবং ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবার মাঠপর্যায়ে বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছে প্রশাসন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি গাছীদের হাতে তুলে দেন খেজুর গাছের চারা, গাছ কাটার মানসম্মত দা এবং রস সংগ্রহের ভাড় বা মাটির পাত্র। দীর্ঘদিনের লোকসানি বা অবহেলিত পেশা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এই প্রণোদনা গাছিদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধান অতিথি ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ গাছীদের মাঝে প্রণোদনা বিতরণ করেন। প্রণোদনা সামগ্রীর মধ্যে ছিল খেজুর গাছের চারা, গাছ কাটার মানসম্মত দা এবং রস সংগ্রহের ভাড় (মাটির পাত্র)।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) জি. এম. এ. মুনীব, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মেসবাউর রহমান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম. এ. সালাম, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা গোলাম মোর্শেদ, সহকারী সেক্রেটারি মাস্টার কামাল আহমেদ, পৌর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা আওলিয়ার ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম চঞ্চল প্রমুখ।
শত বছরের ঐতিহ্য আর আধুনিক বাণিজ্যের এমন মেলবন্ধনে চৌগাছার খেজুর গুড় শুধু যশোরবাসীর জন্যই নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিতে এক সুবাতাস বইয়ে দেবে— এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।


























