দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে মেধার দ্যুতি ছড়িয়েছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌর এলাকার হেলাই গ্রামের শিক্ষার্থী রুকাইয়া পারভীন। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন ‘এ প্লাস’ অর্জন করে সে শুধু নিজের পরিবার নয়, পুরো এলাকার জন্য বয়ে এনেছে অনন্য গৌরব। তবে এত বড় সাফল্যের পরও শঙ্কার কালো মেঘ জমেছে তার চোখেমুখে। অভাবের তাড়নায় থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে মেধাবী এই তরুনীর প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন।
রুকাইয়া পারভীন হেলাই গ্রামের দরিদ্র দম্পতি রকিব মল্লিক ও লাভলী ইয়াসমিন দম্পতির কনিষ্ঠ কন্যা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ও অদম্য জেদ ছিল। সেই অধ্যবসায়ের জোরেই সে ২০২৪ সালে স্থানীয় সলিমুন্নেছা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে। ধারাবাহিক সেই সাফল্যেরই প্রতিফলন ঘটে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায়—সরকারি মাহতাব উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন ‘এ প্লাস’ অর্জন করে সে আবারও নিজের মেধার মুন্সিয়ানা দেখায়।
তবে রুকাইয়ার এই সাফল্যের মুকুটে লুকিয়ে রয়েছে এক হার না মানা সংগ্রামের গল্প। তার বাবা রকিব মল্লিক পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকচালক। প্রতিদিন তীব্র রোদ-বৃষ্টিতে ইজিবাইক চালিয়ে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই বড় কোনোমতে চলে তাদের সংসার। এই নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে মেয়ের পড়াশোনার চাকা সচল রাখা এবং ব্যয়বহুল কোচিং বা উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো তার দরিদ্র বাবার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেধাবী মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বাবা-মায়ের।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে রুকাইয়া পারভীন বলে, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখি পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। ইচ্ছা আছে বুয়েট বা কোনো ভালো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার এবং ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হওয়ার। সেই লক্ষ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় বাবার পক্ষে একা এই খরচ চালানো অসম্ভব। অর্থের অভাবে হয়তো আমার সব স্বপ্ন মাঝপথেই থমকে যাবে—এই ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। সমাজের বিত্তবান ও শিক্ষানুরাগী মানুষ একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে আমি আমার স্বপ্ন সত্যি করতে পারব।’
রুকাইয়ার বাবা রকিব মল্লিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি অসম্ভব টান। কষ্ট করেও ওকে বর্তমানে খুলনায় রেখে কোচিং করাচ্ছি। আমিও বুকভরা আশা নিয়ে চাই, মেয়েটা প্রকৌশলী হোক। কিন্তু সামান্য ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে মেয়ের ইউনিভার্সিটির খরচ দেবো কী দিয়ে? কোনো হৃদয়বান মানুষ বা প্রতিষ্ঠান যদি একটু সাহায্য করে, তবে আমার মেয়ের মেধাটা এভাবে হারিয়ে যাবে না।’
রুকাইয়ার এই অদম্য মেধা আর চরম সংগ্রামের গল্প এখন গোটা এলাকাজুড়ে আলোচনার বিষয়। শিক্ষক, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষানুরাগী মানুষেরা যদি এই অদম্য মেধাবীর পাশে দাঁড়ান, তবে রুকাইয়া তার লক্ষ্য ছুঁয়ে একদিন দেশের একজন দক্ষ প্রকৌশলী হিসেবে দেশ ও দশের সেবা করতে পারবে। আর্থিক অনটন যেন এই সম্ভাবনাময় জীবনের আলো নিভিয়ে দিতে না পারে—এটাই এখন সবার সম্মিলিত আকুতি।


























