তুলির আঁচড়ে সাদা ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে মেহনতি মানুষের ঘাম, সংগ্রাম আর গর্বের উপাখ্যান। কুমোরের চাকা, রিকশাওয়ালার পেডেল, কৃষকের হাল কিংবা জেলের জাল—সবকিছুই যেন প্রাণ পেয়েছে রঙের পরশে। গত ৩০ অক্টোবর থেকে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে শুরু হওয়া চিত্রশিল্পী মুরারি মোহনের পাঁচ দিনব্যাপী Real Artist of Society শীর্ষক একক চিত্র প্রদর্শনী মঙ্গলবার নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল শিল্পীর আঁকা মোট ৪০টি চিত্রকর্ম। পুরো প্রদর্শনীর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের কর্মজীবন। শিল্পী তাঁর রংতুলিতে জীবন্ত করে তুলেছেন—কুমোর, বেদে কন্যা, গৃহিণী, রিকশাচালক, পালকি ও বেয়ারা, গাছি, কলুর বলদ, শ্রমিক, আবর্জনা পরিষ্কারক, সাপুড়ে, নরসুন্দর, গণিকা, তাঁতি, বায়োস্কোপওয়ালা, হালচাষী, রানার, কৃষক, সোনার ফসল, ঢালি, কামারশালা, যাযাবর, ঠেলাগাড়ি চালক, কাবাডি খেলোয়াড়, রাখাল, চর্মকার, জেলে, মেহনতি মায়ের সংগ্রাম, চা শ্রমিক ও মাঝিদের জীবনসংগ্রাম।
শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি প্রদর্শনীতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ছয়টি উজ্জ্বল নক্ষত্রের স্মরণ ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বিশেষ গ্যালারি রাখা হয়েছিল। সেখানে স্থান পেয়েছিল বাউল সম্রাট শাহ লালন ফকির, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতি।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নওরোজ আলম চপল। এতে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলাম রন্টু, এস এম সুলতান ফাইন আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ শামীম ইকবাল লিপন, চিত্রশিল্পী মফিজুর রহমান রুণ্নু, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজেদ রহমান বকুল, দৈনিক রানারের ডেপুটি এডিটর প্রণব দাস, মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ বৈরাগী এবং যশোর ইনস্টিটিউটের নাট্যকলা সম্পাদক আলমগীর হোসেন বাবু প্রমুখ। চিত্রশিল্পী কৃষিগৌতমের সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রদর্শনীর শিল্পী মুরারি মোহন।
বক্তারা বলেন, মুরারি মোহনের ছবিগুলো নিছক কোনো চিত্রকর্ম নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক ইতিহাসের এক একটি জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষকে তাদের কাজের বৈচিত্র্যসহ প্রাধান্য দেওয়ায় এই প্রদর্শনী নতুন প্রজন্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
ক্যানভাসে শিল্পীর মুন্সিয়ানা সম্পর্কে বক্তারা বলেন, মুরারির তুলির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ‘মানুষ’। রাজপথের সাধারণ রিকশাওয়ালা, মাঠের কৃষক, কামারশালার লোহা গলানো আগুন কিংবা ট্রেনের এসি কামরায় আরামে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রী এবং তার পাশেই দরজায় ঝুলে থাকা সাধারণ মানুষের ভিড়—সবকিছুই তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘শ্রমিকের বোঝা’, ‘কামারশালা’ ও ‘হালচাষ’ ছবিগুলোতে শ্রমের ঘাম ও রোদের তাপ যেন সরাসরি গায়ে লাগে। এ ছাড়া ‘রানার’ ছবির মাধ্যমে রাতের আঁধারে ল্যাম্প ও বর্শা হাতে ছুটে চলা রানারকে ফুটিয়ে তুলে সুকান্তের ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ কবিতার আবহকে যেন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তিনি।
প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিল্পীর নিজস্ব একটি প্রতিকৃতি। লাল টুপি পরা ওই ছবির পেছনে দুটি অস্পষ্ট মুখ—যা কেবল পোর্ট্রেট নয়, বরং এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের সংলাপ। এছাড়া যশোরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হলের লাল ইটের স্থাপত্যকে তিনি আলো-ছায়ার খেলায় নতুন প্রাণ দিয়েছেন।
মায়াবী এই প্রদর্শনী মাকে উৎসর্গ করে শিল্পী মুরারি মোহন বলেন, ‘আমি মূলত সেই মানুষগুলোকে আঁকি, যারা এই সমাজটাকে টিকিয়ে রেখেছে। তাদের না বলা গল্পগুলোই আমার ক্যানভাসের গল্প।’
বক্তারা এক বাক্যে স্বীকার করেন, এই প্রদর্শনী যশোরের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কোনো কৃত্রিমতা বা নকল নয়, বরং নিজের শহর ও মানুষের প্রতি অগাধ ভালোলাগা আর আন্তরিকতা থেকেই এই শিল্পকর্মগুলো সৃষ্টি করেছেন মুরারি মোহন। ৪০টি ছবির এই মেলবন্ধন প্রমাণ করেছে—শিল্প কেবল অভিজাতদের বিনোদন নয়, শিল্প মাটি, মানুষ, রাস্তাঘাট ও মেহনতি মানুষের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।


























