মঙ্গলবার ০৩ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমার সহোদর কমরেড দীপু

আবুল বাশার সাইফুদ্দৌলা

প্রকাশিত: ১৮:৫৫, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৮:৫৮, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আমার সহোদর কমরেড দীপু

শহীদ কমরেড আবু বকর জাফরুদ্দৌলা দীপু ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময়ে কমরেডদের শীর্ষ এক নেতার নাম ছিল আবু বকর।

কমরেড দীপুর পিতা প্রয়াত আব্দুল হাসিব ব্রিটিশবিরোধী কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সন্তানও সেই আদর্শ ধারণ করে বড় হবে—এই ভাবনা থেকেই তিনি ছেলের নাম রেখেছিলেন আবু বকর। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে শহীদ কমরেড দীপু তার নামের সার্থকতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শহীদ কমরেড দীপুর পিতা প্রয়াত সাংবাদিক আব্দুল হাসিব ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী একজন ব্যক্তি, যিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পেশাগত জীবনে প্রথমে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরে এবং পরবর্তীতে একটি বীমা কোম্পানিতে সফল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি যশোর প্রেস ক্লাব ও পরবর্তী সময়ে প্রেস ক্লাব যশোরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সর্বশেষ তিনি দৈনিক লোকসমাজের সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘকাল।

আব্দুল হাসিবের নয় সন্তানের মধ্যে কমরেড দীপু ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বড় বোন অধ্যাপক নার্গিস বেগম শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মরহুম কমরেড দীপুর ভাগ্নে যশোরের গণমানুষের নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বর্তমানে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।

কমরেড দীপুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাতক্ষীরা শহরের জুবিলী প্রাইমারি স্কুল থেকে।  সেখান থেকে পেশাগত কারণে পিতা আব্দুল হাসিব যশোরে চলে এলে দীপু ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে। সেখানে অধ্যয়নকালে ১৯৫৮ সালে যখন প্রচণ্ড আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, তখন থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে পড়েন। পড়াশোনার পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন।

১৯৬৪ সালে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাস করে তিনি যশোর এম এম কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে আইএসসি ও বিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলেজ জীবন জুড়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে সংগঠনের প্রতিটি কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন বড় বোন নার্গিস বেগম, যিনি সে সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এর যশোর জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রের সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

৬৮-৬৯ সালের দিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ঠিক সেই সময়ে তৎকালীন সরকারি ছাত্র সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় যশোর মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজে আইয়ুব খানের ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন শহীদ কমরেড দীপু। ছাত্র রাজনীতি করতে করতেই তাঁর যোগাযোগ হয় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। ধীরে ধীরে কমরেড আসাদ, তজো, নজরুল, হাফিজ ও মানিকের মতো তিনিও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।


১৯৭০ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতি ছেড়ে গ্রামে চলে যান এবং কমিউনিস্ট পার্টির গোপন রাজনীতির সাথে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হন।  ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ যশোর কারাগার ভেঙে কমরেড অমল সেন, বৈদ্যনাথ বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট সৈয়দ গোলাম মোস্তফা ও গকুল বিশ্বাসকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে শহরের অন্য কমরেডদের সাথে কমরেড দীপুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পার্টির হেডকোার্টার শালিখার পুলুম গ্রামে কমরেড নূর মোহাম্মদের সাথে তিনি চলে যান।

একই বছরের ১৩ অক্টোবর নড়াইলে পাক বাহিনী ও রাজাকাররা নলদি বাজারে আক্রমণ চালায়। সেই সম্মুখযুদ্ধে যশোবন্তপুরে ৯ জন পাক সেনা নিহত হয় এবং যুদ্ধে কমরেড পন্টু শহীদ হন। 
কমরেড দীপু পাক বাহিনীর আক্রমণ থেকে কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান। ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর ইপিসিপিএমএলের বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলে তিনি সব কমরেডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নড়াইলের খলিসাখালী গ্রামে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে নলদীচর ও বাঘারপাড়ার বিভিন্ন বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি প্রচুর পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। ‘প্রাথমিক রাজনীতি’ নামে তাঁর একটি বই ১৯৭৭ সালে সাপ্তাহিক গণশক্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া মার্কসীয় দর্শনের ওপরও তিনি বেশ কিছু লেখা রেখে গেছেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাক বাহিনী নিরস্ত্র জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়, সে সময় সর্বাগ্রে কমরেড দীপুর মতো অকুতোভয় সেনানিরাই আমজনতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে কমরেড আসাদ, মানিক, শান্তি, তোজো, ফজলু, ইসহাক, নজরুল, হাফিজ ও হেমসহ অসংখ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য শহীদ হন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে তৎকালীন সরকারের জাতীয় রক্ষী বাহিনীর হাতে কমরেড সিরাজ শিকদারসহ হাজার হাজার বামপন্থী রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা ও গুমের শিকার হন। কমরেড দীপুও তাদেরই একজন। ১৯৭৪ সালের ১ নভেম্বর তিনি ঘোপের বাসা থেকে বের হয়ে বাবলাতলা ঢাকা রোড ব্রিজের কাছ থেকে কালিগঞ্জমুখী বাসে যাত্রা করেন। ওই বছরের ৪ নভেম্বর কোটচাঁদপুরের পুষ্প বলরামপুর গ্রামে পার্টি নির্ধারিত স্থানে সভা করার সময় রক্ষী বাহিনী সেখানে অতর্কিত হামলা চালায়।

সেখানে উপস্থিত কমরেড দীপু (গোপন নাম গোরা), কমরেড রাশিদা (গোপন নাম ঝর্ণা), কমরেড মহিউদ্দিন বিশ্বাস (গোপন নাম আলো), কমরেড হায়দার আলী গাজী ও কমরেড তবিবর গ্রেপ্তার হন। রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা কমরেড তবিবর ছাড়া বাকি সবাইকে হত্যা ও গুম করে। তবে গ্রেপ্তারের পর পথিমধ্যে কমরেড তবিবর বাওড়ে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য, কমরেড মহিউদ্দিন ও কমরেড ঝর্ণা ছিলেন আপন ভাইবোন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যখন কমিউনিস্ট আন্দোলনকে নতুন করে বিনির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই কমরেড দীপু শহীদ হন। 

চরম বিপর্যয়ের পরও নিজ মেধা ও যোগ্যতায় তিনি তদানীন্তন ইপিসিপি (এম-এল) এর বৃহত্তর যশোর জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন শহীদ কমরেড দীপু দেখেছিলেন, তার সেই আত্মত্যাগ তখনই সার্থকতা লাভ করবে, যেদিন তার সে স্বপ্ন এ দেশে বাস্তবায়িত হবে।

(লেখক: শহীদ কমরেড দীপুর আপন ছোট ভাই)

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: