দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পর অবসরে গেছেন। বাম প্রগতিশীল ঘরানার রাজনীতির সাথে যুক্ততাও তাঁর অনেক দিনের। নিজেও লেখালেখি করেন। পাশাপাশি লেখকদের সংগঠিত করতে বহুদিন ধরে লেখক শিবিরের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। পঠনপাঠনের অভ্যাস গড়ে তুলতে তরুণ-যুবকদের উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। যশোরে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও অগ্রগণ্য একজন। গল্পকার পাভেল চৌধুরী বাড়িতে রয়েছে নিজস্ব বড় একটি গ্রন্থাগার। তার সেই ব্যক্তিগত পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যাও সুপ্রচুর। সংখ্যায় সেটি ৪ হাজারেরও বেশি।
পাভেল ভাইকে প্রায় দুই দশক ধরে চিনি, মৈত্রী অফিসে তাঁকে প্রথম দেখি। দলটির পার্টি অফিসে মাঝে মধ্যে আসতেন। তখন শুনতাম গবি জোটের (গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট) নেতা তিনি; বদরুদ্দিন উমরের দল জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল করেন। সেই সময়টাতে তাঁর বিশাল গ্রন্থশালার খবর আমার জানা ছিল না। গত বেশ কয়েকবছর ধরে ‘বইবাড়ি’ নিয়ে লেখায় হাত দেয়ার পর অধ্যাপক মাহবুব মুর্শিদ শাহীন ও গাজী ফরিদ আহমেদের কাছে পাভেল চৌধুরীর সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত পাঠাগারটির কথা শুনি।
শহরের চারখাম্বায় তাঁর বাড়িতে যখন পৌঁছই তখন দুপুর ছুঁই ছুঁই। শতবর্ষী বাড়িটি বনেদিয়ানার ছাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে; সামনের বেশ অনেকখানি ফাঁকা জায়গা গাছপালার পাতায় ছায়াঘন। জিতু ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে পাভেল ভাই তাঁর বাড়িটির নিচতলার একটি কামরায় প্রবেশ করেন। কক্ষটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ল একটি টেবিলের ওপর বইয়ের উঁচু ঢিবি। একটি আলমারি ও বড় শেলফ ভর্তি রাশি রাশি বই। একটি র্যাকে বিভিন্ন পত্রিকার সংগ্রহ।
দেখলামÑ আলমারিটির একটি তাকে শুধুমাত্র কবিতার বই, সংখ্যায় প্রায় এক’শর কাছাকাছি। দুর্লভপ্রায় কবিতার বইও রয়েছে আলমারির ওই তাকটিতে। আবু সয়ীদ আইয়ুব সম্পাদিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ নামক বইটিতে এখন থেকে এক’শ বছরেরও বেশি সময় আগে রচিত অনেক কবিতার সংগ্রহ রয়েছে। বুকশেলফটিতে তারাশঙ্কর, মানিক ও বিভূতিভূষণসহ আরো বড় বড় অনেক লেখকের গল্প ও উপন্যাসের বইয়ের ঠাসবুনোট।
আলাপচারিতায় অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী বলেন, বই সংগ্রহের প্রবণতাটা আমারা মধ্যে পারিবারিকভাবে গড়ে উঠেছে। বাবা নিয়মিত রিডার ডায়জেস্ট রাখতেন, এটি পছন্দ করতেন তিনি। ভাই বোনদেরও সবার বইয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। তাঁরা সবাই বইপত্রিকা সংগ্রহ করতেন। এভাবে পাকিস্তান আমলে আমাদের বাড়িতে বইপত্রের সংগ্রহটা বেশ ভালোই ছিল। সেই সময় আমিও কিছু বই সংগ্রহ করেছি, যদিও অনেক ছোট ছিলাম তখন।
তিনি বলেন, জিলা স্কুলে পড়াকালীন আনোয়ার আলম ব্রার্দাসে গিয়ে প্রথমে বই পছন্দ করে আসতাম । এরপর ওই বইটি কেনার জন্য টাকা জমাতে থাকতাম। টাকা জমানো হয়ে গেলে বইটি কিনে আনতাম। সেসব বইয়ের বেশির ভাগ ছিল রুশ সাহিত্যের অনুবাদ; এক আনা দুই আনা করে দাম পড়তো। তবে, টাকা জমানোর পর পছন্দের বইটি কিনতে গিয়ে যখন দেখতাম বিক্রি হয়ে গেছে; তখন মনটা খুব খারাপ হয়ে যেত।
তিনি জানান, তখনকার দিনে স্টেশনের স্ট্যান্ডার্ড বুক পাবলিশার্শে রুশ ও চীনা সাহিত্যের বাংলা অনুবাদের অনেক ভালো ভালো বই পাওয়া যেত। সেখান থেকেও অনেক বই কিনতেন।
অধ্যাপক পাভেল চৌধুরীর বাড়ির ওপরের তলাতেও বইয়ের প্রাচুর্য। একটি ঘর ভর্তি কেবল বই আর বই। যেখানে যতটা পারা যায় বই রাখা হয়েছে। সেখানকার বইয়ের সমাহার দেখে চোখ দুটি যেন স্বপ্নাতুর হয়ে যায়। একটি শোকেস, তিনটি বুক শেলফ ও টেবিল ভর্তি করা বই। দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে ঢোকার পর বুক শেলফের একটির দরজা খুলে দিলেন পাভেল ভাই। দেখা গেলÑসেটি বোঝাই করা রবীন্দ্র ও নজরুলের রচনাবলী, বদরুদ্দিন উমরের লেখা সব বই।
দোতলার আরেকটি কক্ষে বসে পড়াশোনা করেন পাভেল চৌধুরী। সেই ঘরের টেবিল ভরা বই। সেখানে দেখা মিলল দুর্লভ একটি বইÑজলধর সেনের লেখা ‘কাঙাল হরিনাথ’। বইটি বহুবছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল, যার কোন কপি পাওয়াটা এখন একরকম দুঃসাধ্য।
‘বইবাড়ি লুট’
একাত্তর সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাভেল চৌধুরীদের বাড়ি থেকে প্রায় অধিকাংশ বই লুট হয়ে যায়। লুটপাটকারীরা এসব বই সের দরে বিক্রি করে দেয়। সেসময় লুট হওয়া বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার Ñবলেন পাভেল চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বাড়িতে আবারো বইয়ের সংগ্রহ গড়ে ওঠে। যার বেশির ভাগই তিনি সংগ্রহ করেছেন। কারণ, তাঁর ভাইয়েরা কেউ আর এখানে থাকেননি।
ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেটে ম্যারিয়েটা নামে একটি দোকানে খুব ভালো ভালো বই পাওয়া যেত। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই দোকান থেকে অনেক বই কিনেছি। এ ছাড়া ঢাকার ফুটপাত থেকেও অনেক বই কেনা হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সব বই পাওয়া যেত ফুটপাতে একসময়। বাইতুল মোকাররম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাতে তখন বই বিক্রি হোত-বলেন পাভেল চৌধুরী।
তিনি বলেন, আমার সংগ্রহের বেশির ভাগ বই-ই সাহিত্য, ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ক। যদ্দুর পেরেছি এগুলোর ওপর বই সংগ্রহ করেছি। এ ছাড়া রাজনীতির ওপরও অনেক বই সংগ্রহে আছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সৈয়দ মুজতবা আলী ও মানিকের রচনাবলী সংগ্রহ করেছি। এর বাইরে অন্য কারোর রচনাবলী সংগ্রহের ইচ্ছে আমার নেই। তবে আহমদ শরীফের রচনাবলী সংগ্রহ করব বলে ভেবে রেখেছি।
বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শওকত আলীÑঅধ্যাপক পাভেল চৌধুরীর প্রিয় লেখক। তাঁদের লেখা প্রায় সব বই-ই সংগ্রহ করেছেন। এ ছাড়া মঞ্জু সরকারের উপন্যাস তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। মঞ্জু সরকারের বেশকিছু বই তার সংগ্রহে আছে। এ ছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র, অমিয়ভূষণ মজুমদার, জগদীশ গুপ্ত, কমলকুমার মজুমদারসহ ক্লাসিক পর্যায়ের প্রায় সব লেখকের বই তিনি সংগ্রহ করেছেন।


























