বুধবার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বইবাড়ি

রুন্নু’র ‘স্টাডি-রুম কাম আর্ট গ্যালারি’ বিস্ময় জাগানিয়া বইয়ের জগৎ

সালমান হাসান রাজিব

প্রকাশিত: ১৫:১০, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

রুন্নু’র ‘স্টাডি-রুম কাম আর্ট গ্যালারি’ বিস্ময় জাগানিয়া বইয়ের জগৎ

স্টাডি রুমটির দেয়াল জুড়ে বিচিত্র ও নান্দনিক সব চিত্রকর্ম। আর বুকশেলফ ভর্তি হাজার হাজার বই। ছোট, মাঝারি ও বৃহদাকৃতির বুকশেলফগুলোতে বই ছাড়াও রকমারি ম্যাগাজিন ও সাহিত্য-পত্রিকার ঠাস বুনোট। এসব ছাড়াও রয়েছে, বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ও রেফারেন্স বই। সবমিলিয়ে জ্ঞানের কোন্ শাখার বই যে সংগ্রহে নেই; তার যেন ইয়ত্তা নেই। লেখক, গবেষক ও চিত্রশিল্পী মফিজুর রহমান রুন্নু’র ‘স্টাডি-রুম কাম আর্ট গ্যালারি’ বিস্ময় জাগানিয়া এক বইয়ের জগৎ। সেখানে রাজত্ব করছে এক পৃথিবী বই।
ইটের জাফরির ফাঁক গলানো কোমল রোদে আলোছায়াময় সিঁড়ির ঘরটিতে সবুজ ছড়াচ্ছে পাতাবাহার। একেক সারি সিঁড়ির শেষ ধাপের পর একপ্রস্থ মেঝেতে টব জুড়ে সবুজের সমারোহ চোখ জুড়ায়। দোতলায় ওঠার শেষ সিঁড়িটি ডিঙিয়ে দরজা খুলতেই চোখ আটকে যায়- দেয়াল জোড়া বিচিত্র সব চিত্রকর্মে; ঢোকার মুখের এই ঘরটির মেঝেতেও ফ্রেমে বাঁধানো ছবি এদিক সেদিক। 
এর পাশের ঘরটি স্টাডি রুম। এখানে ঢোকার মুখেই একটি বুক শেলফ, তার পাশে একটি টেবিল ও কতকগুলো চেয়ার। কক্ষটির দেয়ালে ও মেঝেতে রাখা ফ্রেমবন্দি ছবিগুলোর একটির ক্যানভাসে বিচিত্র রং-রেখায় আঁকা সবুজের মাঝে যশোর পৌর-পার্কের দুই পুকুরের মাঝে জোড়া সাঁকো। আরেকটিতে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের প্রাচীন এই জেলার ঐতিহ্যÑকাঁধে করে বাঁকে খেজুর রসের ভাঁড় ঝুলিয়ে গ্রামের পথে গাছিদের হেঁটে যাওয়ার দৃশচিত্র। আগার দিকে চাঁছা খেজুর গাছে গাছে রসের ঠিলে ঝোলার শীতকালীন মনোরম আবহ। 
ইজেলে ভাষা সৈনিক বিমল রায় চৌধুরীদের বিরামপুরের প্রাচীন জমিদার বাড়িটির জলরঙে আঁকা ছবিটি তুলির ফিনিশিং টাচের অপেক্ষায়। স্টাডি রুমটির আরেকটি ছবিতে স্বয়ং মফিজুর রহমান রুন্নু; জল রঙে আঁকা চিত্রটিতে অবিকল তার মুখচ্ছবি, দুটি শিশুকে কোলে তিনি দাঁড়িয়ে। নিজেকে নিজে এভাবে আঁকার অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে অভিভূত হতে হয়। আলাপচারিতায় রুন্নু জানান, ছবির জমজ শিশু দুটি তার মেয়ের। স্টাডি টেবিলের পেছনের ছবি দুটি মা ও বাবার।
স্টাডি রুমের বেশির ভাগ জুড়ে বই। ঘরটিতে ঢোকার পর ডান হাতে বিশালায়তনের দুটি বুকশেলফে কয়েক হাজার বই। পড়ার টেবিলটির পেছনেও তাক ভর্তি রকমারি বই; পাশের শেলফটিতেও থরে সাজানো রাশি রাশি বই। টেবিলের সামনের র‌্যাকটিতে বিভিন্ন ‘পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত রুন্নু’র নিজের লেখা বইসহ অন্যান্য বইয়ের সংগ্রহ। কথা বলার একফাঁকে পড়ার টেবিলের পাশের শেলফের লম্বা দরজাটা খুলে দিলেন রুন্নু। বললেন, এখানে ম্যাগাজিন ও তার নিজের লেখা বইয়ের পান্ডুলিপির সংগ্রহ। বলে রাখি-রাজনীতি, বিজ্ঞান, ধর্ম,-দর্শনের, পুরাতত্ত্বের ওপর এ পর্যন্ত তার লেখা- ৯টিরও বেশি বই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনী থেকে মুদ্রিত হয়েছে।
খুব ছিমছাম ও গোছালো রুন্নু’র বইয়ের সংগ্রহ; একদম নিখুঁত ও পরিপাটি। তার স্টাডি রুমের দেয়ালের রঙ অফ হোয়াইট, বুক শেলফের ‘কালারটিও’ ঘরের পেইন্টের সাথে ম্যাচ করানো।
একটি র‌্যাকের ওপরটাতে শুধুÑ রুন্নুর নিজের লেখা বই সংগৃহীত। জীবন ও বিবর্তন, বাঙালির লৌকিক ধর্ম, অতঃপর মানুষের ধর্ম, যুক্তিবাদ, বিশ্বাসবাদ বনাম যুক্তিবাদ; ইত্যাদি শিরোনামের বইগুলি সব রুন্নু’র স্বরচিত কিতাবাদি। চিত্রকর, লেখক ও গবেষক রুন্নুর বইসংগ্রহ অবাক করা। জ্ঞানের বহুমাত্রিক কিতাব সমৃদ্ধ তার ব্যক্তিগত পাঠাগারটি। বাংলাদেশের ইতিহাস, ছোটোদের বিশ্বকোষ, বাংলা পিডিয়া। রয়েছেÑ শালপ্রাংশু লেখক বিভূতিভূষণ, মানিক ও তারাশঙ্করসহ বহুবিধ রচনাবলি। এ ছাড়ওা কতশত লেখকের গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধের বই রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে, রুন্নুর সংগ্রহের সবচেয়ে বেশি বই ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে। শিশুদের ছবির বইও আছে প্রায় সাড়ে তিন শ’টি।
‘বইয়ের এই যে নেশা- সেটি আজকের নয়, যখন অনেক ছোট তখনকার স্কুলে তখনও নিয়মিত যাই না, সেই সময়কার আমাদের বাড়িতে একটা দৈনিক ইংরেজি পত্রিকা রাখা হতো, নামটি সম্ভবত ডেইলি অবজারভার। পাকিস্তান আমলের ওই পত্রিকাটিতে কিছু ফিচার ও কমিকস থাকতো, সেগুলো পড়ে সব বুঝতে পারতাম না। বড়োদের কাছ থেকে যখন বাংলায় অনুবাদ করে নিতাম তখন বুঝতে পারতাম। আর এভাবেই বই পড়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহটা তৈরি হয়- রুন্নু বলেন।
তিনি বলেন, বাবা ছিলেন এমএন (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি)। তিনি যখন অ্যাসেমব্লি অ্যাটেন্ড করতে যেতেন; তাঁকে বলতাম ঢাকা থেকে গল্প, ছড়া ও ছোটদের ছবির বই আনতেÑএগুলোর প্রতি খুব আকর্ষণ বোধ করতাম। আব্বা আমাকে কাপড়চোপড় কিনে না এনে দিলেও বই এনে দিতেন। আমার বয়স ছিল তখন চার বছর। আর তখন থেকেই বইয়ের প্রতি আমার একধরণের প্রবল ঝোঁক সৃষ্টি হয়। এরপর যখন ঝিনাইদহ থেকে যশোরে চলে আসি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র; আর সেই সময় থেকে নিজের জমানো টাকায় টুকটাক বই কেনা শুরু করি। সেসময় যশোরে তেমন কোথাও বই পাওয়া যেত না, একমাত্র আনোয়ার আলম ব্রাদার্স ছাড়া। সেই তখন থেকেই বই কালেকশনের যাত্রা শুরু। তারপর যখন একটি বিপ্লবী পার্টির গোপন দলের সাথে যুক্ত হলাম, তখন বইপড়া ও সংগ্রহের মাত্রাটা বেড়ে গেল অনেকখানি। আস্তে আস্তে সেই বই সংগ্রহের পরিমাণ এখন প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি।
রুন্নু জানান, মার্কসবাদী রাজনীতি কারণে বইপাঠ ও জ্ঞানানুশীলন বাড়তে থাকে। কারণটা হলো-মার্কসবাদী রাজনীতি হলো পড়াশোনার রাজনীতি, অধ্যয়নের রাজনীতি। তিনি বলেন, এই রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর মার্কসীয় যত বই সংগ্রহ করতে শুরু করি। যেখান থেকে পাই সংগ্রহ করি। যখন ঢাকায় যেতাম বাংলা বাজারের চলন্তিকা বইঘর নামে একটি দোকান থেকে বই কিনতাম। স্টেডিয়াম মার্কেটেও তখন বই বিক্রি হতো। তবে শাহবাগের বইয়ের দোকান তখনও গড়ে ওঠেনি।
তিনি জানান, গল্প উপন্যাস কম পড়েছেন। নতুন কিছু জানার প্রতি ঝোঁকটা আগাগোড়াই। যার কারণে বিজ্ঞানভিত্তিক ও জ্ঞানমূলক বই বেশি কিনতেন ও সেগুলো পড়তেন। কলেজে পড়াকালীন দর্শনের বই বেশি কেনা হোত। যত বেশি দর্শনের ওপর পড়েছেন ঠিক ততই দর্শনের রেফারেন্স বই কিনেছেন এবং পাঠও করেছেন বেশি বেশি। মার্কসীয় বক্তব্য সমৃদ্ধ, সমাজতত্ত্ব ও সমাজ বিকাশের ওপর বইয়ের পাঠ তার সবচাইতে বেশি। তার লেখালেখির বিষয় বস্তুও দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ব।
 

শেয়ার করুনঃ