বুধবার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সৌন্দর্যের মিনার ‘সিদ্দিপাশার মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ’

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১২:৩৭, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

সৌন্দর্যের মিনার ‘সিদ্দিপাশার মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ’

নীরবতার মধ্যেও কিছু স্থাপনা কথা বলে। মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ তেমনই এক নীরব সাক্ষী- যেখানে সময়, বিশ্বাস আর শিল্প একসাথে মিলেমিশে আছে শত বছরের গল্প হয়ে।
আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমি থেকে প্রায় দেড় মিটার উঁচু একটি প্লাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর সৌন্দর্যে। ইন্দো-ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব মেলবন্ধনে নির্মিত এ মসজিদে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে তার চারটি কর্ণার বুরুজ-যেগুলো ঘূর্ণায়মান খিলান নকশায় কর্নিশ পর্যন্ত উঠে গেছে। কর্নিশ পেরিয়ে বুরুজগুলো যেন আরও আকাশ ছুঁতে চায়- একগম্বুজ সিলিন্ডার ঘড়াসহ টারেট আর শীর্ষের ফিনিয়াল সেই আকাঙ্ক্ষার তীক।
মসজিদের গায়ে উৎকীর্ণ আরবি লিপিতে লেখা রয়েছে ১২৯১ বঙ্গাব্দ ও ১৩০১ হিজরি- যা এই স্থাপনার প্রাচীনতার সাক্ষ্য বহন করে। প্রতিটি দরজার উপরে সূক্ষ্ম কারুকার্য, অর্ধচন্দ্রাকৃতির প্যানেলে খোদাই করা আরবি লিপি, তার ওপর কলেমা- সব মিলিয়ে যেন এক পবিত্র নকশার ভাষা। পার্সিয়ান স্ট্যাকো অলংকরণে ফুল-লতাপাতার নকশা মসজিদের দেয়ালকে করে তুলেছে আরও মাধুর্যময়।
তিনটি সমতল খিলান দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় নির্দিষ্ট দূরত্বে ব্যবহৃত স্তম্ভ, রঙিন স্টেইন গ্লাসের আলো-ছায়ার খেলা, আর কাঠের খিড়কির ঐতিহ্য। মসজিদের চারপাশে নির্মিত ড্রেন, বেষ্টনী দেয়াল, বেলে পাথরের সিঁড়ি ও অষ্টাকোণ বুরুজগুলো স্থাপত্যিক পরিপক্বতার নিদর্শন। প্রতিটি গম্বুজের ওপরে কিউপলা আর ফিনিয়াল ঘড়া নকশা যেন আকাশের দিকে নত মাথায় প্রার্থনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তবে সময়ের ছোঁয়ায় আধুনিকতার রংও লেগেছে এই মসজিদে। টাইলস বসানো হয়েছে, সামনের অংশে সম্প্রসারণ করে টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে। তবুও তার মূল সৌন্দর্য আজও অটুট। এখানেই প্রতিদিন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, নামাজে নুয়ে পড়ে মানুষের মাথা, আর প্রাচীন দেয়ালগুলো সেই প্রার্থনার সাক্ষী হয়ে থাকে।
এই অপূর্ব স্থাপত্যের কাছে যেতে হলে যশোর জেলা সদর থেকে পূর্ব-দক্ষিণে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। অভয়নগর উপজেলা থেকে দক্ষিণে প্রায় ২০ কিলোমিটার এগোলেই সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের সীমায় পৌঁছানো যায়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এবং আমতলা-সোনাতলা সড়কের পূর্বদিকে মাত্র পাঁচশ মিটার এগোলেই চোখে পড়ে মিয়াবাড়ি জামে মসজিদের শান্ত মিনার।
গ্রামের পথ ধরে এগোতে এগোতে হঠাৎ করেই যখন মসজিদের গম্বুজ চোখে পড়ে, তখন মনে হয়- এই তো, ইতিহাস যেন নিজেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মিয়াবাড়ি জামে মসজিদ আমাদের ঐতিহ্যের এক দীপ্ত অধ্যায়।

শেয়ার করুনঃ