নিত্যনতুন বিষয়ে লেখালেখির জন্য নিয়মিত পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। আর তাই একজন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে নতুন নতুন বই সংগ্রহ ও নিয়মিত অধ্যয়ন ছিল তাঁর জীবনচর্চার অংশ । ভালো লেখার গুণ অর্জনের ক্ষেত্রে নিয়মিতপঠনপাঠনকে তিনি অন্যতম সূত্র মনে করতেন।
বলতেন, 'সংবাদ গদ্যে হাত পাকানোর একটাই মন্ত্র-রিড, রিড অ্যান্ড রিড।' খবরের কাগজসহ বইপত্র যত পড়বে, ততই শাণিত হবে রিপোর্ট সেন্স এবং বাড়বে লেখার দক্ষতা। শুধু প্রতিবেদন নয়, যেকোনো বিষয়ে ভালো লেখার হাত তৈরি করতেও নিয়মিত পড়াশোনার বিকল্প নেই—এমনটাই মনে করতেন তিনি। এমন চিন্তাধারা থেকেই নিয়মিত বই কেনা একসময় তাঁর নেশায় পরিণত হয়েছিল।
অবশ্য শুধু নিজের জন্যই বই কিনতেন না; নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বই কিনে অন্যদের উপহার দিতেও ভালোবাসতেন। এই অভ্যাসের বশেই গড়ে তোলেন ‘মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার' নামে একটি গণগ্রন্থাগার। পাশাপাশি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তাঁর ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহও । ‘বইই তাঁর একমাত্র সম্বল'- বলতেন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত সাংবাদিক রুকুনউদ্দৌলাহ।
বীরমুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহর সঙ্গে সরাসরি পরিচয় হয় ২০১৪ সালে, দৈনিক সংবাদের যশোর অফিসে। তার আগেও তাঁকে চিনতাম, তবে পরিচয়টা ততটা গাঢ় ছিল না। সাংবাদিকতা পেশায় যাব—এমন ইচ্ছার কথা শুনে আমার নানা (মায়ের মামা), যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ আমাকে রুকুনউদ্দৌলাহ ভাইয়ের কাছে পাঠান ৷ প্রথম যেদিন দৈনিক সংবাদের যশোর অফিসে যাই, সেদিন ফেরার সময় তিনি তাঁর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর’ ও ‘ছোট ছোট কথা, অচেনা মানুষ' বই দুটি আমাকে উপহার দেন। আর বলেন, শুধু সংবাদ নয়, যেকোনো ভালো কিছু লিখতে হলে প্রচুর পড়তে হবে; এর বিকল্প নেই। ‘রিড, রিড অ্যান্ড রিড’-ভালো লেখার এটাই একমাত্র সূত্র।
এরপর তাঁর মাধ্যমে আমি পুরোদস্তুর সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি। সাংবাদিকতায় তিনিই আমার শিক্ষক, আমার গুরু।
রুকুনউদ্দৌলাহর খালধার রোডের বাড়িতে যেদিন যাই, তখন আমি দৈনিক কল্যাণ পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক। তিনি তখন কল্যাণের উপদেষ্টা সম্পাদক। কল্যাণ অফিস থেকে তাঁর বাসায় পৌছাই ভাদ্রের এক পড়ন্ত বিকেলে। বাড়িতে গিয়ে দেখি, ঘরভর্তি শেলফজুড়ে রাশি রাশি বই। আমার নজর যে বইয়ের দিকে, তা বুঝতে পেরে বললেন, ‘চল, তোকে বইয়ের সংগ্রহ দেখাই।'
বাড়ির নিচতলা, ওপরতলা- সবখানেই বই আর বই। প্রত্যেক ঘরে উপচে পড়ছে বই। পড়ার টেবিল, শেলফ, এমনকি বিছানার মাথার কাছেও বইয়ের প্রাচর্য ।
রুকুনউদ্দৌল্লাহ জানান, বই পড়া ও সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন তাঁর অগ্রজ, প্রয়াত আইনজীবী ইতিমউদ্দৌলাহ। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় তিনি তাঁকে বিতর্ক, ছড়া, কবিতা, আবৃত্তি ও প্রবন্ধ পাঠের প্রতিযোগিতায় নিয়ে যেতেন। এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রুকুনউদ্দৌল্লাহ বরাবরই প্রথম-দ্বিতীয় হতেন। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া বইগুলোও ঝটপট
পড়ে ফেলতেন।
তাঁর বই পড়ার এমন উৎসাহ দেখে, আমাকে বলো।' বইটির পাঠপ্রতিক্রিয়াদেখে ইতিমউদ্দৌলাহ মাঝেমধ্যে বলতেন, 'যেবইটি পড়ছ, সেটি পড়ে কী বুঝলে,
শুনতেন এবং লিখতে বলতেন—জানিয়েছিলেন রুকুনউদ্দৌলাহ।
ঈদের সময় জামাকাপড়ের বদলে তাঁকে বই উপহার দিতেন ইতিমউদ্দৌলাহ। আরেক ভাই, বীরমুক্তিযোদ্ধা আসাফউদ্দৌলাহ, তাঁর পাড়ার উৎসাহ দেখে অনেক বই কিনে দিতেন বলেও জানান রুকুনউদ্দৌলাহ। তিনি বলতেন, বই কেনা এখন একটা নেশা হয়ে গেছে। প্রতি মাসে বই কেনার জন্য আলাদা বাজেট রাখি। বাড়ির বাজারের টাকাও অনেক দিন বই কেনায় খরচ করে ফেলি। সহধর্মিণী বাজারের কথা জিজ্ঞেস করলে বলি, সময় পাইনি বলে করা হয়নি। কাল বাজার করে দেব-বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাই।
রুকুনউদ্দৌলাহ জীবনভর গল্প, কবিতা, উপন্যাস, দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতাসহ নানা বিষয়ের বই সংগ্রহ করেছেন। লিখতে গেলে শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হতে হয়—এ কারণে তিনি প্রচুর কবিতার বই কিনতেন ও পড়তেন। তাঁর সংগ্রহে ছিল অসংখ্য কবিতার বই।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর বই সংগ্রহ করাও ছিল তাঁর বড় ধরনের নেশা। তাঁর বিশাল সংগ্রহের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ডকুমেন্টারি, মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকা এবং মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বই।
রুকুনউদ্দৌলাহ মনে করতেন, বইই তাঁর একমাত্র সঞ্চয়, বড় সম্পদ। রাজনীতি করতে, ঝগড়া করতে, গল্প করতে, আড্ডা দিতে, প্রেম করতে, এমনকি রান্না করতেও বই পড়া লাগে। সবকিছু ঠিকঠাক করতে হলে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আর বই পড়ার এই অভ্যাস অনেকটাই আসে পরিবার থেকে। এক আলাপচারিতায় রুকুনউদ্দৌলাহ্ বলেছিলেন, তাঁর একমাত্র কন্যারও একটি মেয়ে। নাতনিকে তাঁর পড়ার উপযোগী প্রচুর বই উপহার দেন। প্রায়ই তাঁর জন্য বই কিনতেন। দুপুরবেলায় নানি গল্প পড়ে আর নাতনি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যায়। ব্যাংকের চাকরির শত ব্যস্ততার পরও তাঁর মেয়ে এখনো বই পড়েন-বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
বই কেনার এই বাতিক দেখে স্ত্রী প্রায়ই তাঁকে বলতেন, ‘এত বই কিনে আর রাখবে কোথায়? বাড়িতে তো বই রাখার আর জায়গা নেই।' তারপরও বই কেনা বন্ধ হয়নি। বইয়ের দোকান থেকে, অনলাইনে অর্ডার করে- প্রতি মাসে বইয়ের জন্য রাখা বাজেট থেকে বই কিনতেন তিনি। এভাবে তাঁর বইয়ের রেজিস্টারে সংগ্রহের সংখ্যা পৌঁছায় ৯ হাজার ৯৪২টিতে।


























