দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদের রাজনীতির বরপুত্র, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক সফল মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। যশোর তথা গোটা দেশের রাজনীতিতে যাঁর অবদান অবিস্মরণীয়, সেই ক্ষণজন্মা এই নেতার প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন।
শিক্ষাজীবন ও ছাত্ররাজনীতির অগ্নিঝরা দিনগুলো
১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোরে জন্ম নেন তরিকুল ইসলাম। তাঁর পিতা আব্দুল আজিজ ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মাতা মোসাম্মৎ নূরজাহান বেগম গৃহিণী। ১৯৫৩ সালে যশোর জিলা স্কুলে ভর্তি হয়ে ১৯৬১ সালে প্রবেশিকা পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এম এম) কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে আইএ এবং ১৯৬৮ সালে অর্থনীতিতে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালে যশোর সরকারি এম এম কলেজের জরাজীর্ণ শহীদ মিনার নিজ উদ্যোগে মেরামত করায় তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ১৯৬৩-১৯৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে তিনি যশোর সরকারি এম এম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দীর্ঘ ৯ মাস রাজশাহী ও যশোরে কারাবাস করেন। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় তাঁকে আবারও কারাবরণ করতে হয়।
১৯৭০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেন তরিকুল ইসলাম। পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ন্যাপ থেকে প্রথমে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। তিনি ছিলেন বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক কমিটির ৭৬ সদস্যের অন্যতম এবং যশোর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক। বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০০৯ সালে পঞ্চম কাউন্সিলে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটির সদস্য’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বহুল পরিচিত দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশকের দায়িত্বেও ছিলেন।
তরিকুল ইসলাম ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিলুপ্ত যশোর-৯ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ষষ্ঠ এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময় তিনি সমাজকল্যাণ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকারের সময় প্রথমে তথ্য এবং পরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জনকল্যাণে কাজ করতে গিয়ে তিনি নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি কিডনি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
বরেণ্য এই নেতার অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিনের ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ সকালে কারবালা কবরস্থানে তাঁর কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, দুস্থদের মাঝে জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ বিতরণ এবং দিনব্যাপী গণভোজের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৪ নভেম্বর মুন্সী মেহেরুল্লাহ ময়দানে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর।
তরিকুল ইসলাম শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক আলোকবর্তিকা। তাঁর প্রয়াণ দিবসে এই জনপদের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে তাদের প্রিয় নেতাকে।


























