রোববার ০৮ মার্চ ২০২৬

২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

’আকিজ রিসোর্সের’ পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক, এবার কর্মকর্তার অবৈধ পিস্তল প্রদর্শন

রানার প্রতিবেদক, ঢাকা অফিস

প্রকাশিত: ২৩:১৮, ৭ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ২৩:২৩, ৭ মার্চ ২০২৬

’আকিজ রিসোর্সের’ পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক, এবার কর্মকর্তার অবৈধ পিস্তল প্রদর্শন

যশোরের শিল্প ও বাণিজ্য নগরী নওয়াপাড়ায় 'আকিজ রিসোর্স গ্রুপের' প্রতিষ্ঠানের পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক। গেল নভেম্বর মাসে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রতারণার মাধ্যমে বিএডিসির সরকারি সার আত্মসাত করে কালোবাজারে পাচারের ঘটনায় অফিসকক্ষে ডিবি পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয়েছিলো নগদ ২২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। তবে সেই ঘটনার রেশ না কাটতেই একই অফিস কক্ষে আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবৈধ পিস্তল প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইতোমধ্যে ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম নিয়েছে।
জানা গেছে, পিস্তল প্রদর্শনকারীর নাম বশির আলম। তিনি আকিজ রিসোর্স গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) পদে কর্মরত।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, বশির আলম অফিস কক্ষে প্রবেশ করে একটি পিস্তল বের করেন এবং উপস্থিত সকলের সামনে তা উঁচিয়ে ধরেন। এরপর তিনি পিস্তলের ম্যাগাজিন লোড করে আবারও প্রদর্শন করে পরে কোমরের পেছনে প্যান্টের ভেতরে রাখেন। 

খোদ অফিস কক্ষে এমন কর্মকাণ্ড দেখে সকলের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, আগেও বশির আলম অবৈধ অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে 'আকিজ রিসোর্স গ্রুপের' জনসংযোগ কর্মকর্তা মাকসুদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, 'ভিডিওটি তাদেরও নজরে এসেছে। পরে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত বশির আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সাময়িকভাবে অফিসের সব ধরণের দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।

এ বিষয়ে অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম নূরুজ্জামান জানান, ঘটনাটি নিয়ে থানা পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানী 'আকিজ গ্রুপের' প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আকিজ উদ্দিনের ছেলে শেখ জসিম উদ্দিনের মালিকানাধীন 'আকিজ রিসোর্স গ্রুপ' সিমেন্ট, শিপিং, ভোগ্যপণ্য, ট্রেডিং, সার আমদানী, বিএডিসি ও বিসিআইসির সার পরবহণ ঠিকাদারীসহ অন্তত ২৫ ধরণের ব্যবসায় যুক্ত। গত কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির আরেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান 'বঙ্গ ট্রেডার্সের' কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকির সার কালোবাজারে বিক্রি করাসহ বিভিন্ন অপকর্ম করছে। অভিযোগ রয়েছে, অপকর্ম ধরা পড়লে ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই ট্রাক চালক, হেলপার, ব্রোকার কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারী বিরুদ্ধে মামলা করে। তবে পরবর্তীতে তা খুব বেশিদূর যায় না।

ইতোপূর্বে যারা অভিযুক্ত, এখনো তারা কর্মরত : 

আকিজ রিসোর্স গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মেসার্স বঙ্গ ট্রেডার্স লিমিটেড বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসির) অনুমোদিত সার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বিএডিসির চালানে আকিজ রিসোর্সের নামে অভয়নগর থানাধীন নওয়াপাড়ার বন্দর ঘাট থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সার সরবরাহ করে থাকে।

এরই ধারাবাহিকতায় মেসার্স বঙ্গ ট্রেডার্স লিমিটেডের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে গত ৯ নভেম্বর বিকেলে সাতটি চালানে সাতটি ট্রাকে সর্বমোট ৪ হাজার ৮৪০ বস্তা সার (মূল্য প্রায় ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা) বোঝাই করে রংপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী জেলার বিএডিসি গোডাউনের উদ্দেশ্যে ট্রাকগুলো অভয়নগর থানাধীন সর্দার জুট মিল ঘাট, মক্কা ঘাট এবং বড়বাড়ি ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। গোডাউনে সার পৌঁছানোর নির্ধারিত তারিখ ছিল ১২ নভেম্বর।


কিন্তু ছয় দিন পর ১৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা বাবুল দাস ও ১৭ নভেম্বর পবিত্র কুমার কুণ্ডু নিজেদের বাঁচানোর জন্য ই-মেইলের মাধ্যমে আকিজ রিসোর্সের প্রধান কার্যালয়ে জানায় সাতটি ট্রাকের চালকেরা সব সার চুরি করে অন্যত্র বিক্রি করে পালিয়েছে। অভিযুক্তরা সার চুরি করে পালানোর বিষয়ে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পুনরায় ঘটনাস্থল থেকে ২ হাজার ৪৪০ বস্তা সার ট্রাকে লোড দেওয়ার জন্য আকিজ রিসোর্সের অনুমতি চাই। 
ওই ঘটনায় আকিজ রিসোর্সের স্টোর অ্যান্ড ইনভেন্টর অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এমরুল কায়েস বাদী হয়ে অভয়নগর থানায় মামলা দায়ের করেন। 
পরে ২৩ নভেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মেসার্স বঙ্গ ট্রেডার্সের অফিস কক্ষ থেকে কর্মচারীসহ তিন আসামিকে গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে নগদ ২২ লাখ ২৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় সে সময় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন ও পবিত্র কুমারের নাম আলোচনায় আসলে তারা গাঁ ঢাকা দেন। এমনকি প্রচার চালানো হয়, তাদেরকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। তবে কয়েকমাসের ব্যবধানে অভিযুক্তরা নিয়মিত অফিসে কর্মরত থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। 

স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে সরকারি সার কালোবাজারি, পরিমাপে কম দেওয়া, কখনো নিন্মমানের ভেজা-রোদে শুকানো সার রি-প্যাকিং এবং সর্বশেষ পিস্তল প্রদর্শনের মতো একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে জন্ম দিয়েছে নানান প্রশ্ন।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

শীর্ষ সংবাদ: