যশোরের ভবদহ অঞ্চলে নদী খননের কাজ বিলম্বে শুরুসহ খননকাজের নানা তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলেছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। খননেন ক্ষেত্রে তলদেশের গভীরতা, প্রশস্ততা ও নদীর উপরিভাগের তথ্য প্রকাশে গড়িমসি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড রহস্যজনক লুকোচুরি করছে। যেটি দায়িত্বহীনতা ও অনিয়ম বলে দাবি করেছেন কমিটির নেতৃবৃন্দ। তথ্য গোপানে অবান্তর যুক্তি দেখাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) - সংবাদ সম্মেলন করে এমন অভিযোগ করেছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।
বৃহস্পতিবার যশোর শহরের নীলরতন ধর রোডে সংগঠনটির অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছাড়াও একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জনগণের দাবি অনুযায়ী- সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ৮১ কিলোমিটার নদী খনন বিলম্বে হলেও শুরু হয়েছে। এ কাজে বরাদ্দের পরিমাণ ১৪০ কোটি টাকা। কিন্তু কাজের বিবরণ ও খনন স্থলে সাইনবোর্ডের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য জনগণকে অবহিত করাসহ সরকারি বাধ্যবাধকতা বিলম্বে কার্যকরী করা হয়েছে। বোর্ডে নদী খননে নদীর তলদেশের প্রশস্ততা, গভীরতা ও নদীর উপরিভাগের প্রশস্ততার বিবরণ বোর্ডে প্রকাশ করা হয়নি। বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে এ ব্যাপারে তথ্য জানতে চাওয়া হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড তা জানানোর ক্ষেত্রে নানা অবান্তর যুক্তি দিয়ে যাচ্ছে। রহস্যজনক কারণে লুকোচুরি করা হচ্ছে। এটা স্পষ্ট দায়িত্বহীনতা ও অনিয়মের পর্যায়ে পড়ে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং প্রতিষ্ঠানকে সামগ্রিক সমাধানে প্রকল্প প্রস্তাবনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে জনগণ আশাবাদী হয়ে ওঠেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটিকে তদারকিতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত মানা হয়নি, এ কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। কাজের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। এদিকে, অবহিত হয়েছি, নদী খননের মেয়াদ জুন ২০২৬ পর্যন্ত থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না বলে মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য বলা হচ্ছে। দ্রুত কোনো একটি বিলে টিআরএম এবং পর্যায়ক্রমে বিলে বিলে টিআরএম বাস্তবায়নের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে ফাইল বন্দি থাকলে এবং নদী খননের সাথে সাথে প্রস্তাবিত বিলে টিআরএম বাস্তবায়ন না করা হলে, দ্রুততম সময়ে খননকৃত নদী ভরাট হয়ে যাবে এবং সব টাকা অপচয় হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অনেক চাপাচাপির পর পানি উন্নয়ন বোর্ড ভবদহ স্লুইসগেটের ২১ ভেন্টের প্রথমে ২ টি, পর্যায়ক্রমে ৪ টি, ৯টি ও ১২টি খোলা হয়। এখন ১৭ টি পর্যন্ত গেট চালু করার সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে। গেট খুলে দেয়ার পর যে গতিতে পানি নিষ্কাশিত হয়েছে, তার কারণেই এবার জলাবদ্ধতার মাত্রা কম। ফলে অধিক জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয়েছে। পাম্পিং ব্যবস্থা যে অকার্যকর তা প্রমাণিত হয়েছে। পাম্পকে কেন্দ্র করে যে অর্থ অপচয় হয়েছে ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার জন্য পাম্প অন্যতম কারণ তা জনসমক্ষে প্রতীয়মান হয়েছে। এই অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আবারও ৫টি পাম্প পানি সেচের সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাউবো, আমরা তার অর্থ খুঁজে পাই না। এর কোনো প্রয়োজন নেই।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের সিদ্ধান্ত দেড় বছর অতিক্রম করেছে, টাকা বরাদ্দ ও টেন্ডার হবার পরও জমি অধিগ্রহণে গড়িমসি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে আছে। কেন দ্রুত অধিকরণ কাজ বিলম্বিত হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। দ্রুতই যদি জমি অধিগ্রহণ ও খাল সংস্কারের কাজ সম্পাদন করা না হয়, তাহলে সামনে বর্ষায় জনপদ আবারও জলাবদ্ধতার শিকার হবে। এ পরিস্থিতিতে পরিষ্কার যে জনপদ আবারও জলাবদ্ধতার বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবি-
৮১ কিলোমিটার নদী খনন কাজের ক্ষেত্রে অন্য দিকের কাজ সংকুচিত করে হরি, তেলিগাতি নদী ২০ কিলোমিটার ও আপার ভদ্রার ২২ কিলোমিটার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন করতে হবে। তাহলে বর্ষা মৌসুমে দ্রুত পানি নিষ্কাশিত হয়ে যাবে। দ্রুত প্রস্তাবিত টিআরএম বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প অনুমোদন করে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ভবদহে স্লুইসগেটের ২১, ৯ ও ৩ ভেন্টের সব গেট সচল করতে হবে। নতুন করে ৫টি পাম্প কিনে অর্থ অপচয় করার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। আমডাঙ্গা খালের জমি অধিকরণ ও সংস্কার কাজ বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই সম্পাদন করতে হবে। ভবদহ জনপদের ক্ষতিগ্রস্ত ফসল ও বাড়িঘরে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। মুক্তেশ্বরী, ভৈরব ও ভৈরব-মাথাভাঙ্গা নদ-নদী সংযোগ দিতে হবে। জলাবদ্ধতার কারণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের নদী পানি ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক পর্যালোচনা করতে হবে। নদী থেকে সমস্ত অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব চৈতন্য কুমার পাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ ও তসলিম-উর-রহমান, সদস্য জিল্লুর রহমান ভিটু, অনিল বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাস, মাসুদ শেখ, সাধন বিশ্বাস, রাজু আহম্মেদ, পার্থপ্রতিম বৈরাগী, সুখেন্দু বিশ্বাস, মহিতোষ বিশ্বাস, রাশেদা বেগম প্রমুখ।


























