৫০ ডলার দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরুর ১৩ বছরে দুই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, নতুনদের শেখাচ্ছেন ‘দক্ষতাই আসল পুঁজি’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার। অধিকাংশ শিক্ষার্থী যখন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার রুটিনে আটকে, তখন যশোরের এক তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজে নেমে পড়েছিলেন। ২০১২ সালে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে প্রথম আয় মাত্র ৫০ ডলার। সেই তরুণের প্রতিষ্ঠানে আজ শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। তিনি ভিক্টর সাহা-যশোরের আলোচিত তরুণ উদ্যোক্তা, যিনি এখন নতুন উদ্যোক্তাদের মাঝে স্বপ্নের বীজ বুনছেন।
দুই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ভিক্টর সাহা
বর্তমানে ভিক্টর সাহার অধীনে চলছে দুটি বড় প্রতিষ্ঠান। একটি যশোর শহরের নাজীর শঙ্করপুর এলাকায় অবস্থিত ভিক্স ভেন্সারস। এটি একটি আইটি ফার্ম, যেখানে মূলত ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্স সেবা দেওয়া হয়। অন্যটি যশোরের রূপদিয়ায় অবস্থিত রাখি কসমেটিকস এন্ড কনজিউমার প্রোডাক্টস। শুরুতে এখানে শুধু চুলের তেল উৎপাদন হলেও পরবর্তীতে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে শ্যাম্পু, স্ক্যাল্প সিরাম ও অন্যান্য চর্ম-সৌন্দর্য পণ্য যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনেই ‘ন্যাচারাল বাই রাখি’ নামে একটি ই-কমার্স ব্র্যান্ডও পরিচালিত হচ্ছে।
‘২০ হাজার টাকায় ব্যবসা?’ ভিক্টরের সাফ উত্তর : আগে দক্ষ হন
দৈনিক রানারের পক্ষ থেকে ভিক্টর সাহাকে জিজ্ঞাসা করা হয়- ২০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে বললে কী করবেন?
তার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘বর্তমানে এত কম পুঁজি দিয়ে কার্যকরভাবে ব্যবসা শুরু করা খুবই কঠিন। ব্যবসা করতে যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজি লাগে।’
ভিক্টরের মতে, যদি কারও কোনো বিশেষ দক্ষতা না থাকে, তবে আগে সেই ২০ হাজার টাকা নিজেকে দক্ষ করে তোলার কাজে ব্যবহার করা উচিত। নিজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যেহেতু তাঁর ডিজিটাল মার্কেটিং দক্ষতা আছে, তিনি এই পুঁজি দিয়ে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে সেই দক্ষতা বিক্রি করে একটি ই-কমার্স এজেন্সি গড়ে তুলতেন।
‘বর্তমানে অনলাইন মার্কেটিং সেবা খুবই চাহিদাসম্পন্ন,’ বলেন ভিক্টর। তার মূল কথা-২০ হাজার টাকায় সফল ব্যবসার জন্য আগে নিজেকে দক্ষ করে তোলা জরুরি। পুঁজির চেয়ে দক্ষতাই বড়।
মেন্টর পথ দেখায়, হাঁটতে হয় নিজেকেই
সফলতার পথে মেন্টরের ভূমিকা নিয়ে ভিক্টর বলেন, ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে অনেকে তাকে মেন্টর হিসেবে সহায়তা করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুজতাহিদুল ইসলাম, কোচ মুহাম্মদ ইলিয়াস কাঞ্চন ও সাবিত রায়হান। তারা তাকে কৌশল, মনোভাব এবং ব্যবসার নানা উপদেশ দিয়েছেন।
তবে ভিক্টর স্পষ্ট করে জানান, ‘মেন্টর থেকে শুধু শেখা যায়। দিন শেষে মূল কাজটা নিজেকেই করতে হয়। মেন্টর কেবল গাইডলাইন দিতে পারে, কাজের বাস্তব প্রয়োগ এবং পরিশ্রম আপনাকেই করতে হবে।’
পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের সূত্র : সমস্যার সমাধান দিন
পার্সোনাল ব্র্যান্ড গড়ার ক্ষেত্রে ভিক্টরের পরামর্শ সহজ। যে ব্যক্তি যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং যা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন, সেই বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করতে হবে।
‘কনটেন্ট যদি পাঠকদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব সমস্যা সমাধান বা অনুপ্রেরণা যোগ করে, তাহলে ওই বিষয় নিয়ে দ্রুত অথেনটিক অনুসারীর একটি শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে ওঠে। আর তার মাধ্যমেই ব্যক্তির ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী হয়,’ বলেন তিনি।
শেখার জন্য বইয়ের বিকল্প নেই, তবে সময়ের অভাবে পডকাস্ট ভরসা
নবপ্রজন্মের শিক্ষা নিয়ে ভিক্টর বলেন, ‘কারও যদি কিছু শেখার থাকে তবে বইয়ের ওপর যতটা সম্ভব ভরসা রাখা উচিত। বইয়ের বিকল্প কিছুই হতে পারে না।’ তার প্রিয় বই ‘সুখের সমীকরণ’, যা পড়ে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
তবে ব্যক্তিগতভাবে হাতে সময় কম থাকায় নিয়মিত বই পড়তে পারেন না বলে জানান ভিক্টর। তাই শিক্ষার আধুনিক মাধ্যম হিসেবে তিনি পডকাস্ট শোনা এবং বিভিন্ন অনলাইন কোর্সে অংশ নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেন।
ভবিষ্যতের জন্য একটাই পরামর্শ : এআই শিখুন
ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সবাইকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শেখার পরামর্শ দেন ভিক্টর। তার মতে, আধুনিক যে কোনো খাতে কর্মরত ব্যক্তির জন্য জানতে হবে তার ক্ষেত্রে ‘এআই’ কীভাবে কাজে লাগে এবং তা থেকে কীভাবে সুবিধা নেওয়া যায়।
‘যারা আগামী দিনে এআই সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণে অনীহা দেখাবেন, তাদের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি হবে,’ সতর্ক করেন তিনি। তাই এখন থেকেই প্রতিটি সেক্টরের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের এআই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা যায়।
স্বপ্ন দেখুন, দক্ষ হন, লেগে থাকুন
ভিক্টর সাহার গল্পটা শুধু ৫০ ডলার থেকে শত কর্মীর প্রতিষ্ঠান গড়ার গল্প না। এটা দক্ষতা, পরিশ্রম আর সময়ের দাবি বোঝার গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই যে তরুণ ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলেন, তিনি আজ অন্যদের চাকরি দিচ্ছেন। তার মন্ত্র পরিষ্কার- পুঁজি কম থাকলে আগে নিজেকে পুঁজি বানান। দক্ষতা অর্জন করুন। তারপর মাঠে নামুন। কারণ মেন্টর পথ দেখাবে, কিন্তু হাঁটতে হবে আপনাকেই।


























