নারী গ্রাহকদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা প্ল্যাটফর্ম ‘তারা’ নিয়ে নবম বছরে পদার্পণ করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক । এই সময়ে ‘তারা’ দেশের পাঁচ লাখেরও বেশি নারীর আস্থার আর্থিক সহচর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাংকিং সেবার সীমা ছাড়িয়ে এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ নারী আর্থিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে নারীদের রিটেইল ডিপোজিট পোর্টফোলিওর প্রায় ২৫ শতাংশই রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’ সেগমেন্টে। ২০১৭ সালের ৪ মে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল রিটেইল থেকে এসএমই—নারীর সম্পূর্ণ আর্থিক যাত্রায় সমর্থন প্রদান।
‘তারা’ মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে—‘তারা রিটেইল’ এবং ‘তারা এসএমই’। এই দুই সেগমেন্টের মাধ্যমে নারী গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ব্যাংকিং থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা সম্প্রসারণ পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কর্মজীবী নারী, গৃহিণী, শিক্ষার্থী ও প্রবীণ—সব শ্রেণির নারীদের জন্য ‘তারা রিটেইল’ তৈরি করেছে বিশেষায়িত ব্যাংকিং কাঠামো। বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার নারী গ্রাহকের মোট ডিপোজিট দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, নারীরা কেবল ব্যাংকিং সেবার অংশ নয়; তারা একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সেগমেন্ট। তাদের জন্য আলাদা ও সমন্বিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ৯ বছরে লাখো নারীর জীবনে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা আমাদের দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন। তবে এটি কেবল শুরু—নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়নে আমাদের অঙ্গীকার আরও বিস্তৃত হবে।’
গত ৯ বছরে এই সেগমেন্টে গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ গুণ এবং ডিপোজিট বেড়েছে ৬০ গুণেরও বেশি। বিশেষভাবে জনপ্রিয় ‘হোমমেকার্স অ্যাকাউন্ট’ গৃহিণীদের জন্য আয়ের প্রমাণের বাধা দূর করেছে। গ্রাহকদের ৯৮ শতাংশই ডিজিটাল ই-কেওয়াইসি (ব-কণঈ) পদ্ধতিতে যুক্ত হয়েছেন।
ভার্চুয়াল সেভিংস অ্যাকাউন্ট, ডেবিট কার্ডসহ আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা এখন সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে নারীদের হাতের নাগালে। নারীদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ‘তারা’ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস, মা দিবস ও স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাসে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়।
এছাড়া ‘তারা অ্যাম্বাসেডর ট্রেনিং প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে ১২০ জন ফ্রন্টলাইন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নারী গ্রাহকদের আরও কার্যকর সেবা দিতে পারেন। নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ‘তারা এসএমই’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তা এই সেবার আওতায় আছেন। এই সেগমেন্টে লোন পোর্টফোলিও দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৬০০ কোটি টাকা এবং ডিপোজিট ২,৮০০ কোটি টাকার বেশি। গত এক বছরে ডিপোজিট প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭২ শতাংশ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, নারী উদ্যোক্তাদের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ১.১৪ শতাংশ, যা ব্যাংকিং খাতে নারীদের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ। উদ্যোক্তা উন্নয়নে ‘তারা উদ্যোক্তা মেলা’, ‘উদ্যোক্তা ১০১’, ‘উদ্যোগতারা’ এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে হাজারো নারীকে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে।
দেশের ৬৪ জেলার ১৯১টি শাখার মাধ্যমে প্রতি বছর ২,০০০-এরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে আর্থিক সাক্ষরতা ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ২,০০০ নারী উদ্যোক্তাকে বিনামূল্যে ইআরপি সফটওয়্যার প্রদান করা হয়েছে, যাতে তারা ব্যবসা ডিজিটালভাবে পরিচালনা করতে পারেন।
নারী অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে অবদানের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর উইমেন থেকে একাধিক পুরস্কারসহ ৭টি আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছে ‘তারা’।


























