দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বারখ্যাত যশোর আজ এক তাৎপর্যপূর্ণ দিনের প্রহর গুনছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নানা জল্পনা-কল্পনা এবং প্রত্যাশার আবহে আজ সোমবার জেলায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে গোটা জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও, সেই উচ্ছ্বাসের অন্তরালে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে বাস্তব উন্নয়ন দেখার আকাক্সক্ষা।
সরকার গঠনের পর যশোরে এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। ফলে রাজনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি উন্নয়ন সম্ভাবনার দিক থেকেও সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফরের মধ্য দিয়েই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবকাঠামো, সংস্কৃতি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর কার্যকর উদ্যোগের সূচনা হতে পারে।
উলাশী থেকে উন্নয়নের বার্তা
সফরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী যাবেন শার্শার ঐতিহাসিক উলাশীতে। সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর স্মৃতিবিজড়িত ‘উলাশী-যদুনাথপুর খাল’ পুনঃখনন প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। বহু বছর ধরে অবহেলিত এই খালটি পুনরুজ্জীবিত হলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শার্শা উপজেলার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘এই খাল একসময় আমাদের এলাকার প্রাণ ছিল। পানি থাকলে জমি বাঁচে, আর জমি বাঁচলে কৃষক বাঁচে—এই বাস্তবতা আমরা প্রতিদিন অনুভব করি। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচের সংকট তীব্র হয়েছে, ফলে অনেক জমি পতিত পড়ে থাকে। যদি সরকার এই খালটি সঠিকভাবে পুনঃখনন করে এবং পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে, তাহলে শুধু উৎপাদনই বাড়বে না, আমাদের জীবিকা ফিরে পাবে স্থিতি। আমরা চাই এই উদ্যোগ যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং এর সুফল আমরা নিজের চোখে দেখতে পারি।’
স্বাস্থ্যখাতে যুগান্তকারী প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যশোর মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে ভোগা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি একটি বহুল প্রতীক্ষিত উদ্যোগ।
যশোর শহরের বাসিন্দা রাশেদা খাতুন বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলে বড় কোনো অসুখ হলেই আতঙ্ক শুরু হয়—কোথায় নিয়ে যাব, কীভাবে চিকিৎসা করাব। বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতে হয়, আর সেই যাত্রা অনেক সময় রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল গড়ে ওঠে, তাহলে অসংখ্য মানুষ নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে। আমরা চাই এই প্রকল্প শুধু ঘোষণা হয়ে না থাকে, দ্রুত বাস্তবে রূপ পাক এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হোক।’
দলীয় নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে যশোর জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। শহরের প্রধান সড়কগুলো তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুনে সজ্জিত হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রচার মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, ‘বিএনপি শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও যশোরের কৃতী সন্তান সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের স্বপ্ন ছিল। সেই অপূর্ণ স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাধ্যমে পূরণ হতে যাচ্ছে। এতে যশোরবাসী উচ্ছ্বসিত।’
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যশোরবাসীর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে আরও কিছু দাবি তুলে ধরা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহনেওয়াজ ইমরান বলেন, ‘আমাদের নেতার আগমন আমাদের জন্য শুধু আনন্দের নয়, এটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর নেতৃত্বে যশোর আবারও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে। আমরা চাই, এই সফরে এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসুক যা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে যশোরকে একটি আধুনিক জেলায় পরিণত করবে।’
যশোর সরকারি এমএম কলেজের শিক্ষার্থী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘যশোরে শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নেই, ফলে বাধ্য হয়ে অনেককে ঢাকামুখী হতে হয়। যদি শিল্প, আইটি বা অন্য কোনো কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প নেওয়া হয়, তাহলে আমরা নিজেদের জেলাতেই ভবিষ্যৎ গড়তে পারব। আমরা চাই, এই সফর তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিক।’
বিভিন্ন দাবি
নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানও চান যশোরবাসী। বিশেষ করে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন, একটি সংস্কৃতি ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি, আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত, যশোর বেনাপোল মহাসড়ক ছয় লেন, যশোর বিমানবন্দকে আন্তর্জাতিক মানের উন্নতিকরণ, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। এছাড়া রয়েছে, প্রচীনতম শহর যশোরকে সিটি কর্পোরেশনে রুপান্তরের ঘোষণার দাবিও।
ভবদহ এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভবদহের জলাবদ্ধতা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর পানিবন্দি থেকে আমরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। ফসল নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। আমরা অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান পাইনি। আমরা চাই, নদী খননের পাশাপাশি বিলে বিলে টিআরএম কার্যক্রম চালু করে এবং প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন করা হোক।’
ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, ‘যশোর জেলার মানুষ হিসাবে আমার প্রথম দাবিÑযশোরের অভিশাপ ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান। নদী খননের সাথে বিলে বিলে টিআরএম ও জমি অধিগ্রহণ করে আমডাঙা খাল সংস্কার করতে হবে।’
শহরের ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘যশোর শহরের প্রধান সমস্যা এখন যানজট ও জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়। যদি ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা যায় এবং একটি পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তাহলে শহরের চিত্রই বদলে যাবে।’
রেল যোগাযোগে জোরালো দাবি
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ করে রেল খাতে নতুন দাবি উঠেছে। যশোর-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেন চালুর দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শামীম হোসেন বলেন, ‘যশোর থেকে ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রেন সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক মাধ্যম, কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা কম হওয়ায় টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। নতুন ট্রেন চালু হলে এবং সময়সূচি ঠিকভাবে মেনে চলা হলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেক কমে যাবে।’
স্মারকলিপিতে নানা দাবি
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। এতে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু, সদর হাসপাতালে আইসিইউ ও কিডনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্র স্থাপন, ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ যশোর জেলা কমিটির সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নেতা তসলিম উর রহমান বলেন, ‘যশোরে এখনো আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে ওঠেনি। আমরা চাই, দ্রুত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ করা হোক এবং সদর হাসপাতালে আইসিইউ ও ডায়ালাইসিস সুবিধা চালু করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা পেতে পারে।’
বৃহত্তর যশোরের রেল সেবার উন্নয়নে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভোরবেলা বেনাপোল থেকে যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে আরো একটি আন্তঃনগর ট্রেন এবং দর্শনা (গেদে সীমান্ত) থেকে যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে দুইটি আন্তঃনগর ট্রেন দিতে হবে। ঢাকা-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল বা দর্শনা সীমান্ত রুটে অন্তত একটি লোকাল ট্রেন দিতে হবে। দর্শনা থেকে খুলনা পর্যন্ত ডবল লাইন রেলপথ চালু করতে হবে, সুবিধাজনক যে কোনো স্টেশনে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) স্থাপন করতে হবে।
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ২৭ এপ্রিল যশোরে আসছেন। এজন্য আমরা যশোরবাসীর গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে রেল সেবার উন্নয়নে একগুচ্ছ দাবি তার কাছে উপস্থাপন করেছি। যাতে তিনি গুরুত্ব বিবেচনা করে যশোর সফরকালে এই দাবি পূরণ করতে পারেন।’
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে জেলায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। যশোর বিমানবন্দর থেকে জনসভাস্থল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।
সব মিলিয়ে যশোরবাসীর প্রত্যাশা-এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উন্নয়নের সূচনা ঘটাবে।


























