যশোরের কেশবপুর অঞ্চলের মীর্জানগর একসময় রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজধানীকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, আর সেই সূত্র ধরেই নানা পেশার মানুষ আশপাশের গ্রামগুলোতে এসে বসবাস শুরু করেন। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতায় মীর্জানগরের পাশে অবস্থিত সাতবাড়িয়া গ্রাম হয়ে ওঠে এক বিশেষ শিল্পের কেন্দ্র-পালকি নির্মাণ শিল্পের কেন্দ্র। এই গ্রামে এসে বসতি গড়েন বস্ত্রশিল্পী ও কাঠশিল্পীরা, যাঁদের হাতের নিপুণ কারুকাজ একসময় সমগ্র বঙ্গজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল।
সাতবাড়িয়ার কাঠশিল্পীদের তৈরি পালকি ছিল গুণমান ও নান্দনিকতায় অনন্য। এখানে ছোট সাড়ে তিন ফুটের পালকি থেকে শুরু করে সাড়ে সাত ফুট দৈর্ঘ্যের বড় পালকি পর্যন্ত তৈরি হতো। পালকি তখন শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও রুচির প্রতীক। জমিদার, ধনী ব্যবসায়ী কিংবা অভিজাত শ্রেণির মানুষ পালকিকে ব্যবহার করতেন আভিজাত্যের প্রকাশ হিসেবে। সাতবাড়িয়ার শিল্পীরা সেই চাহিদা পূরণ করতেন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে।
বাংলা ১৩১৬ সাল, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১১৬ বছর আগে কলকাতার এক সাংবাদিক সাতবাড়িয়া গ্রাম পরিদর্শন করেন। তাঁর লেখায় উঠে আসে এই গ্রামের শিল্পসমৃদ্ধ চিত্র। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রামের পালকির কারখানাগুলোতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় চার শত পালকি মজুত ছিল, যা বিক্রির অপেক্ষায় থাকত। এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়, সাতবাড়িয়ার পালকি শিল্প কতটা বিস্তৃত ও সংগঠিত ছিল। এটি নিছক কুটিরশিল্প নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনব্যবস্থা।
পালকি তৈরিতে যে কাঠ ব্যবহার করা হতো, সেটিও ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্যের। কাঠশিল্পীরা মূলত পুঁয়ের বৃক্ষের কাঠ ব্যবহার করতেন। এই কাঠের তক্তা উজ্জ্বল রক্তবর্ণের, ওজনে হালকা হলেও বহনে যথেষ্ট ভারসক্ষম। সেগুন কাঠের মতোই সহজে পালিশ করা যেত, ফলে পালকির চারপাশে এই কাঠ ব্যবহৃত হতো। শুধু পালকির চাল বা ছাদের জন্য ব্যবহার করা হতো কদম্ব গাছের কাঠ। কাঠ নির্বাচনের এই সূক্ষ্ম জ্ঞান প্রমাণ করে, সাতবাড়িয়ার শিল্পীরা কেবল কারিগরই নন, প্রকৃতি ও উপকরণের গভীর বোঝাপড়াও তাঁদের ছিল।
পুঁয়ের কাঠ পাওয়া যেত যশোর ও বরিশাল অঞ্চলে। সেখান থেকে কাঠ সংগ্রহ করে সাতবাড়িয়ায় এনে পালকি তৈরি করা হতো। তৈরি হওয়ার পর এই পালকি পাঠানো হতো বঙ্গের নানা প্রান্তে। বিভিন্ন মেলা ও বাজারে সাতবাড়িয়ার পালকি বিক্রি হতো দারুণ সুনামের সঙ্গে। এই শিল্প গ্রামটির অর্থনীতিকে যেমন- শক্তিশালী করেছিল, তেমনি বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাহন সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল।
সাংবাদিক তাঁর লেখায় আরও উল্লেখ করেন, সাতবাড়িয়া গ্রাম কলকাতা থেকে খুব দূরে নয় এবং বি.সি. রেলের ধারে ঝিকরগাছা স্টেশন থেকে অতি নিকটে অবস্থিত। রেল যোগাযোগের এই সুবিধা পালকি বাণিজ্যকে আরও প্রসারিত করেছিল। সহজ পরিবহন ব্যবস্থা থাকায় ব্যবসায়ীরা সহজেই পালকি কলকাতাসহ অন্যান্য অঞ্চলে পাঠাতে পারতেন।
আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালকির ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত। আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে হারিয়ে গেছে একসময়ের এই ঐতিহ্যবাহী বাহন। তবু ইতিহাসের পাতায় সাতবাড়িয়া গ্রামের পালকি শিল্প আজও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই শিল্প বাংলার কারিগরি দক্ষতা, নান্দনিক রুচি ও গ্রামীণ শিল্পসংস্কৃতির জীবন্ত দলিল।


























