যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ নদ তীরবর্তী ত্রিমোহিনী গ্রাম এক সময় সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। নদীর ধারে হওয়ায় নৌপথে যোগাযোগের সুবিধা ছিল, যার ফলে বাজার গড়ে ওঠে এবং শিল্প-উদ্যোগ সমৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে এই গ্রামে স্থাপিত বড় চিনি কারখানা তখনকার সময়ের গর্ব ছিল। খেজুরের রস থেকে ব্রাউন সুগার তৈরি হত এখানে। বুড়ি ভদ্রা নদী গ্রামটির পাশ থেকে পুব দিকে প্রবাহিত হওয়ায় ‘ত্রিমোহিনী’ নামকরণটি হয় নদীর তিনটি মোহিনী বা প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে।
ত্রিমোহিনী শুধু শিল্পের জন্যই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে থেকেও সমৃদ্ধ ছিল। ১৮৫০ সালের ১৮ মে ইংরেজ নীলকর টমাস ম্যাচেল ত্রিমোহিনী ভ্রমণ করেছিলেন। তার দিনলিপিতে উল্লেখ আছে, তিনি চিনি কারখানার কার্যক্রম যেমন : খেজুর ও আখের রস জ্বালানো, রাম মদ তৈরি প্রক্রিয়া এবং উৎপাদনের পরিমাণ উৎসাহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “ত্রিমোহিনী ফ্যাক্টরি দেশের অন্যতম বড় চিনি কারখানা। ছ’মাসে এখানে ৪০ হাজার মণের বেশি চিনি উৎপাদিত হয়। তবে নীল উৎপাদনের চেয়ে চিনি উৎপাদনের প্রক্রিয়া অনেক কঠিন। জ্বাল দেওয়ার ঘরে গরম অসহনীয়, বাতাসে কটু গন্ধ আর চারপাশে আবর্জনার স্তূপ।”
ফ্যাক্টরির পাশে ত্রিমোহিনী বাজার এবং রাস্তা ছিল, যা উত্তর দিকে সোজা, পুব দিকে মীর্জানগর হয়ে কেশবপুরে, দক্ষিণে সাগরদাড়ি এবং পশ্চিমে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় সংযুক্ত ছিল। এখানে নৌপথ এবং স্থলপথের মাধ্যমে নানা ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিল্প জীবনের সমন্বয় এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিত।
ত্রিমোহিনী গ্রামে শিবের পূজা এবং মানত প্রথাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচেল বর্ণনা করেছেন, বিকেলে তিনি এক অদ্ভুত উৎসবের সাক্ষী হন। একটি বড় চড়কে মানুষদের হুকে ঝুলিয়ে ঘোরানো হত। অন্যদিকে, লোহার তীর শরীরে গেঁথে আগুন জ্বালানোর রীতি ছিল। এই সব ক্রিয়া মূলত মানত পূরণের জন্য করা হত। তিনি দেখেন, একটি ছোট মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় ঘোরানো হয় তার বাবার মানত পূরণের জন্য। স্থানীয় জনসমাগম উৎসাহ এবং ঢাকের তালে নেচে উৎসব উদযাপন করছিল।
এই দৃষ্টিনন্দন ও উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য ত্রিমোহিনীকে কেবল শিল্পনগরী নয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিল। গ্রামের মানুষদের জীবনে শিল্প ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সংমিশ্রণ এক অনন্য ঐতিহ্য তৈরি করেছিল। যদিও এখন ত্রিমোহিনী এক সময়ের মতো সমৃদ্ধ নয়, তবে নদী, প্রাচীন চিনি কারখানার ছায়া এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক চেতনা আজও গ্রামটিকে স্মৃতিসিক্ত রাখে।
ত্রিমোহিনী নদী, বাজার, কারখানা এবং উৎসবের মিলিত ছাপ- এই গ্রামটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দিয়েছে।


























