যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পূর্বে, অভয়নগর উপজেলা থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে, চলিশিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে এবং যশোর-খুলনা মহাসড়কের দক্ষিণে দেড় কিলোমিটার অগ্রসর হলেই চোখে পড়ে এক নিভৃত প্রাচীন স্থাপনা- মদন দাসের বাড়ি। চারপাশে সবুজ মাঠ, নির্জন পরিবেশ আর সময়ের স্তব্ধতা যেন বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে এক রহস্যময় আবহে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে এলাকার প্রভাবশালী হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া বিশ্বেশ্বর দাস এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। পারিবারিক বংশপরম্পরায় তার পুত্র কালীচরণ দাস, তার পুত্র মদন দাস এবং মদন দাসের পুত্র বিমল দাস এই গৃহের উত্তরাধিকার বহন করেন। বিমল দাসের পুত্র প্রদীপ দাস বর্তমানে বংশধর হিসেবে পরিচিত হলেও বাড়িটি সরকারি নথিতে মদন দাসের নামেই রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। একটি পরিবারের চার-পাঁচ প্রজন্মের স্মৃতি ও ইতিহাস এই দেয়ালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
স্থাপত্যরীতিতে বাড়িটি ইন্দো-ইউরোপীয় প্রভাব বহন করে। চুন-সুরকি ও বালুর সংমিশ্রণে আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত ভবনটি পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমি থেকে প্রায় দেড় মিটার উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর স্থাপিত। দক্ষিণমুখী এই ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে সাত ধাপের একটি সিঁড়ি, যা এক সময় অতিথিদের অভ্যর্থনার পথ হয়ে উঠত। বারান্দায় ঢোকার জন্য অর্ধবৃত্তাকার পাঁচটি খিলান প্রবেশদ্বার স্থাপত্যের সৌন্দর্যকে আরও শোভিত করেছে।
বাড়িটির ছাদ কাঠের বর্গা ও বিমের ওপর খিলান আকারে নির্মিত- যা সে সময়ের কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ। ব্যবহৃত ইটের মাপ ২৪দ্ধ১০দ্ধ৫ সেন্টিমিটার, ২৬দ্ধ১২দ্ধ৬ সেন্টিমিটার এবং ১৮দ্ধ১০দ্ধ৫ সেন্টিমিটার- বিভিন্ন পরিমাপের ইটের ব্যবহার নির্মাণশৈলীর বৈচিত্র্য নির্দেশ করে। দরজা ও জানালায় লোহার ব্যবহার ছিল নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের জন্য। জানালার উপরে সূক্ষ্ম বামন নকশা, ছাদে জালি নকশা এবং দেওয়ালে ফুল-লতাপাতার অলংকরণ আজও অতীতের রুচিবোধের সাক্ষ্য বহন করছে। উত্তর পাশে ছিল একটি স্পাইরাল সিঁড়ি, যা দিয়ে ছাদে বা উপরের অংশে যাতায়াত করা হতো। মূল প্রবেশপথ ছাড়াও আরও তিনটি পথের অস্তিত্ব বাড়িটির পরিকল্পিত বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
সময়ের নির্মমতায় আজ বাড়িটি ব্যবহারহীন। পরবর্তী সময়ে আধুনিক নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে ছাদের ওপর একটি কক্ষ ও পশ্চিম দেয়ালে একটি টয়লেট নির্মাণ করা হলেও, তা মূল স্থাপত্যরীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লবণাক্ততার প্রভাব ও ছাদের ফাটল বাড়িটির স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ধীরে ধীরে অবহেলায় ক্ষয়ে যাচ্ছে এক সময়ের গৌরবময় স্থাপনা।
অভয়নগরের এই প্রাচীন বাড়িটি ঊনবিংশ শতকের গ্রামীণ জমিদারি-প্রভাবিত সামাজিক কাঠামো, স্থাপত্য রুচি ও জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়ন করা হলে মদন দাসের বাড়ি স্থানীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য সাক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে আরেকটি ইতিহাস।


























