বৃহস্পতিবার ০৫ মার্চ ২০২৬

১৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কিংবদন্তি, কীর্তি ও ঐতিহ্যের জলছবি

যশোরের ভোলা পুকুর

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ২০:১৬, ৪ মার্চ ২০২৬

যশোরের ভোলা পুকুর

যশোর জেলা স্কুল–এর সামনের ঐতিহাসিক পুকুরটির নাম ভোলা পুকুর। এটি শহরের ষষ্টিতলা পাড়ার ভেতরে অবস্থিত হলেও মৌজার নাম বেজপাড়া। দীর্ঘদিন ধরে এই দিঘি স্থানীয় ইতিহাস, লোককথা ও স্মৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।


নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এ দিঘির নির্মাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে জনশ্রুতি রয়েছে, চাঁচড়ার রাজারা জনহিতৈষী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে দিঘিটি খনন করেন। সম্ভাব্য সময়-কাল হিসেবে ১৭শ শতক ধরা হয়। সে সময় বৃহৎ দিঘি খনন ছিল সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগের অন্যতম নিদর্শন।


ভোলা পুকুরকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত কিংবদন্তিটি বেশ নাটকীয়। কথিত আছে, পুকুর খননের পরও দীর্ঘদিন পানি ওঠেনি। এতে রাজা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একদিন স্বপ্নাদেশে তিনি জানতে পারেন, কারাবন্দি ‘ভোলা’ নামের এক ব্যক্তি যদি পুকুরের তলদেশে গমন করেন, তবে পানি উৎসারিত হবে। রাজা সেই নির্দেশ অনুসারে ভোলাকে দিঘির মাঝখানে পাঠান। বলা হয়, তিনি মাঝখানে পৌঁছানো মাত্র প্রবল বেগে পানি উঠতে শুরু করে এবং ভোলা সলিলসমাধি হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনার পর থেকেই দিঘিটির নাম হয়ে যায় ‘ভোলা পুকুর’।


এই পুকুরকে কেন্দ্র করে আরও একটি গল্প স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। শিশিরকুমার ঘোষ, যিনি পরবর্তীতে অমৃতবাজার পত্রিকা– এর সম্পাদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন, তিনি ছাত্রজীবনে যশোর জেলা স্কুলে পড়াশোনা করতেন। তাঁর উপরের ক্লাসে পড়তেন রামচরণ বসু, যিনি পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচিতি পান। একদিন রামচরণ বসু শিশিরকুমার ঘোষকে চ্যালেঞ্জ দেন- পুকুরের তলদেশ স্পর্শ না করে যদি তিনি ৫০ বার ভোলা পুকুর পার হতে পারেন, তবে তাঁকে পদক দেওয়া হবে। দৃঢ় মনোবল নিয়ে শিশিরকুমার ঘোষ সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে ৫০ বার পুকুর পার হয়ে সেই চ্যালেঞ্জ পূরণ করেন। এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে আজও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। শিশির কুমার ঘোষের জীবনীকার শ্রীঅনাথ নাথ বসু তার বইতে লিখেছেন। ঘটনাটি ১৮৫০ সালের দিকের।


হিন্দু লোকজ নীতি অনুযায়ী দিঘিটি উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ মিটার এবং প্রস্থ ৭৫ মিটার। সুপরিকল্পিত গড়ন ও পরিমিত পরিসর এ দিঘির ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য বহন করে।
বর্তমানে ভোলা পুকুর স্থানীয় জনগণের সুপেয় পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও, এই দিঘি আজও ইতিহাস, কিংবদন্তি ও কৃতিত্বের স্মারক হয়ে যশোরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: