বুধবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঐতিহ্যের পঞ্চরত্ন : অভয়নগরের  শ্রীধরপুর কালীমন্দির

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৭:০৮, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ঐতিহ্যের পঞ্চরত্ন : অভয়নগরের  শ্রীধরপুর কালীমন্দির

যশোরের অভয়নগর উপজেলার শ্রীধরপুর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক কালীমন্দির। যশোর জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, অভয়নগর উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং শ্রীধরপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার পূর্বে, যশোর-নড়াইল সড়কের পশ্চিমে ৩ কিলোমিটার অগ্রসর হলেই চোখে পড়ে এই প্রাচীন স্থাপনা। চারপাশের সবুজ সমতল ভূমির মাঝে যেন সময়কে সাক্ষী রেখে দাঁড়িয়ে আছে উনিশ শতকের এক শিল্প কীর্তি।
জনশ্রুতি বলে, অভয়নগরের শ্রীধরপুরে জমিদার ছিলেন কেদারনাথ বসু। তাঁর পিতা রাজকুমার বসু এবং কাকা ননী গোপাল বসু- এই দুই ভাই উনিশ শতকের প্রথম দিকে এখানে জমিদারি প্রথা চালু করেন। জমিদারি প্রতিষ্ঠার পর তাঁরা নির্মাণ করেন কালীমন্দির, শিবমন্দির, জমিদার বাড়ি ও দিঘি। শিলালিপি না থাকায় মন্দির নির্মাণের সঠিক সাল নির্ধারণ করা যায় না, তবে স্থানীয়রা একে রাজা কৃষ্ণ কুমারের সমসাময়িক বলে মনে করেন। ইতিহাসের দলিল ও লোককথার এই মেলবন্ধনই মন্দিরটিকে ঘিরে সৃষ্টি করেছে এক রহস্যময় আবহ।
ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যরীতি ও পঞ্চরত্ন শৈলীতে নির্মিত শ্রীধরপুর কালীমন্দির নান্দনিকতা ও কারুকার্যের দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বক্র কার্নিশযুক্ত মন্দিরটির চার কোণে চারটি এবং মাঝখানে একটি রত্ন বা চূড়া- মোট পাঁচটি রত্নের সমাহার। কেন্দ্রীয় রত্নটি বাংলা চৌচালা আকৃতির, যা বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য ঐতিহ্যের পরিচায়ক। প্রতিটি রত্নের শীর্ষে ফিনিয়াল সদৃশ অলংকরণ মন্দিরটিকে দিয়েছে এক অনন্য ঔজ্জ্বল্য।
পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে প্রায় এক মিটার উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর চতুষ্কোণ বেদির ওপর নির্মিত মূল মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। ছয় ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় মূল প্রবেশপথে। তিন খিলান সমৃদ্ধ প্রবেশদ্বার, গোলাকার পিলারের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব পিলারের গায়ে পোড়ামাটির ফলকে ফুটে উঠেছে অলংকরণ শিল্পের নিপুণতা। খিলানের ওপরের ফাঁকা অংশে চমৎকার স্টাকো কাজ- ফুল-লতাপাতা, ব্যান্ড নকশা, এমনকি টিয়াপাখির আদলে কারুকাজ- সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত শিল্প ভাণ্ডার। কার্নিসের নিচে চুন-বালির তৈরি ফুলেল নকশা মন্দিরটিকে করেছে আরও শোভামণ্ডিত।
মন্দিরের ভেতরে রয়েছে ভোল্টেড সিলিং, যা স্থাপত্যে দৃঢ়তা ও সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটিয়েছে। সম্মুখ দেওয়ালে স্টাকো অলংকরণ শিল্পীর সূক্ষ্ম নৈপুণ্যের সাক্ষ্য দেয়। ব্যবহৃত ইটের মাপ- ২৫দ্ধ২০দ্ধ৬ সেন্টিমিটার, ১৬দ্ধ১৩দ্ধ৫ সেন্টিমিটার এবং ২৩দ্ধ২০দ্ধ৫ সেন্টিমিটার- ইঙ্গিত করে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মাণ বা সংস্কারের সম্ভাবনার দিকে। বহু ভাজ খিলান ও চুন-বালির প্রলেপ মন্দিরটিকে দিয়েছে প্রাচীনতার ছোঁয়া।
বর্তমানে এখানে নিয়মিত পূজা হয়। প্রাচীন স্থাপত্যে বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও আধুনিক গ্রিলের দরজা সংযোজন করা হয়েছে এবং দুটি দরজা জানালায় রূপান্তরিত হয়েছে। তবে সময়ের নির্মম ছাপও স্পষ্ট- উপরিভাগে জন্মেছে গাছ-লতাপাতা, ফাঙ্গাসের আক্রমণ দেখা যায়, আর পলেস্তারা অনেকাংশে ক্ষয়ে গেছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যোগের অভাবে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ভূমিসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, মন্দিরের জমি বিএস খতিয়ানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত। জেএল নম্বর ৭০, এসএ খতিয়ান নম্বর ১/১ এবং এসএ দাগ নম্বর ১২৪১- এই তথ্য প্রমাণ করে এর সরকারি স্বীকৃতি ও গুরুত্ব।
শ্রীধরপুর কালীমন্দিরটি এ অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। জমিদারি ঐতিহ্য, স্থাপত্যশৈলী, লোককথা এবং বর্তমান পূজা অর্চনা- সব মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের স্মারক। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে শ্রীধরপুর কালীমন্দির হতে পারে যশোর-অভয়নগর অঞ্চলের ঐতিহ্য পর্যটনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সময়ের ক্ষয় রোধে এখন প্রয়োজন সচেতনতা, উদ্যোগ এবং ঐতিহ্য রক্ষার সম্মিলিত অঙ্গীকার।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: