যশোর শহরের পুরাতন কসবা মৌজার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা, স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ‘পুলিশ লাইন সংলগ্ন কালী মন্দির’ নামে। শহরের ভেতরে হলেও এই স্থাপনাটি একসময়কার পুরোনো যশোরের ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক সাক্ষী। মন্দিরটির উত্তর দিকে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে প্রবাহিত হয়েছে ভৈরব নদী, যা একসময় এই অঞ্চলের জনবসতি ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মন্দিরটির কোথাও কোনো উৎকীর্ণ লিপি বা শিলালিপি পাওয়া যায়নি। ফলে এর নির্মাতা বা নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য লিখিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মন্দিরটি সম্ভবত অষ্টাদশ শতকে নির্মিত। কথিত আছে, উড়িষ্যা থেকে আগত জয়তুন পাড়ে নামের একজন প্রভাবশালী ও সম্পন্ন ব্যক্তি এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করলে এই ধারণার কিছুটা সত্যতাও খুঁজে পাওয়া যায়, কারণ মন্দিরটির নির্মাণ রীতি উড়িষ্যার মন্দির স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত এই স্থাপনাটি চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি। সমতল ছাদের উপর রয়েছে মোচাকৃতির একটি গম্বুজ, যা মন্দিরটির প্রধান বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। মন্দিরের মূল বিগ্রহ কক্ষের উপরের ছাদের তলদেশ গোলাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আবৃত। মন্দিরের বারান্দার ছাদ খিলান নকশায় নির্মিত, যা স্থাপনাটির নান্দনিকতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। ছাদ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে লোহার বিম, কাঠের কড়ি ও বর্গা।
মন্দিরে প্রবেশের জন্য রয়েছে দ্বিকেন্দ্রিক খিলান আকৃতির দরজা। প্রবেশপথের প্রধান দরজাটি অর্ধ গোলাকার বহু ভাজ খিলান নকশায় নির্মিত। এ ধরনের খিলান নকশা প্রাচীন স্থাপত্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে। মন্দিরের ভেতরে প্রবেশের জন্য তিনটি বহু ভাজ খিলান দরজা রয়েছে, যা স্থাপনাটির স্থাপত্যশৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনাটিও ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। লবণাক্ততার প্রভাবে মন্দিরের ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণের যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় এর আদি স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অনেকাংশেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমানে মন্দিরটি একাধিকবার সংস্কার ও পুনঃসংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। এসব সংস্কারে আধুনিক নির্মাণ উপকরণ- বিশেষ করে সিমেন্ট ও বালুর মশলা-ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মূল স্থাপত্যরীতির অনেক অংশ পরিবর্তিত বা বিনষ্ট হয়েছে। আধুনিক উপকরণ দিয়ে আস্তর করার কারণে স্থাপনাটির প্রাচীন রূপ অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে।
মন্দিরটির প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিত সংস্কারের ফলে এর মৌলিক প্রত্ন বৈশিষ্ট্য প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমান অবস্থায় প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে এটিকে আর আদি রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলেই মনে করা হয়। তবুও, যশোর শহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কালী মন্দিরটি অতীতের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এখনও স্থান করে আছে।


























