যশোর জেলার শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে অবস্থিত এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা- তিন গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদ। শার্শা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে এবং জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান। প্রত্নস্থল থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে বয়ে গেছে বেতনা নদী, যা পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত। ধারণা করা হয়, মসজিদ নির্মাণের সময় নদীটি ছিল পূর্ণ প্রবহমান, যা এই অঞ্চলের জনবসতি ও ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল।
জনশ্রুতি মতে, মুঘল আমলে এ অঞ্চলে মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে এবং তখনই মসজিদটি নির্মিত হয়। যদিও মসজিদের গায়ে কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি, তবু স্থাপত্যরীতি ও নির্মাণশৈলী থেকে মুঘল প্রভাব স্পষ্ট। কোনো মহামারির কারণে এই গ্রাম হয়ত জনশূন্য হয়ে পড়ে। তাই দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল মসজিদটি। পরে ব্রিটিশ আমলে প্রথমবার সংস্কার হয় এবং পাকিস্তান আমলে ব্যাপক আকারে দ্বিতীয় সংস্কার সম্পন্ন হয়। সে সময় নকশাকৃত পোড়ামাটি ও ইট ব্যবহার করে মসজিদের সামনের দেওয়াল সজ্জিত করা হয়। বারোবাজার এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন মসজিদের সঙ্গে এর স্থাপত্যগত মিল লক্ষ করা যায়, বিশেষত বারোবাজার অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শনের সঙ্গে তুলনায়।
আয়তাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত এ মসজিদের ছাদ তিনটি অর্ধ গোলাকার গম্বুজ দ্বারা আবৃত ছিল। পশ্চিম দেয়ালে অবতল মিহরাব, অষ্টাগোনাল কর্নার টারেট এবং দ্বিকেন্দ্রিক খিলান মুঘল স্থাপত্যশৈলীর পরিচায়ক। আটটি পিলারের সমন্বয়ে গঠিত ছাদে অনুগম্বুজের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। গম্বুজের শীর্ষে পিতলের অলংকরণ ছিল, যা স্থাপনাটির নান্দনিকতা বাড়াত। তিনটি আধা গোলাকার খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথ মসজিদের সামনের অংশকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছিল। জনশ্রুতি রয়েছে, একসময় সামনের দেয়াল অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক দ্বারা অলংকৃত ছিল।
নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে চুন-সুরকি, পাতলা টালি ইট এবং বিভিন্ন মাপের ইট- ১৮দ্ধ১০দ্ধ৪ ইঞ্চি, ২০দ্ধ১২দ্ধ৪ ইঞ্চি এবং ২২দ্ধ১১দ্ধ৪.৫ ইঞ্চি। এসব উপাদান তৎকালীন নির্মাণ রীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে। তবে সময়ের বিবর্তন ও অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে প্রত্ন বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে বিকৃত হয়েছে, ফলে একে আর আদি রূপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
পাকিস্তান আমলে সর্বশেষ বড় সংস্কারের সময় পূর্ব দিকে সম্প্রসারণ করে একটি আধুনিক দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। গম্বুজ অপসারণ, আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, পলেস্তারা করা এবং কেবলা দেয়ালের মিম্বর সংস্কারসহ নানা পরিবর্তনের ফলে মূল প্রত্ন রূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রম মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অনেকাংশে হ্রাস করেছে।
মসজিদটি থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে বাজিতপুর গ্রামে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাজিতপুর গ্রামটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ভৌগোলিক বিভাজনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে নারকেলবাড়িয়ার তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করছ। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।


























