ইতিহাস বড় নির্মম। যে মানুষ একদিন রাজ্য শাসন করেছেন, যাঁর দান-খয়রাতে তৃপ্ত হয়েছে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অসংখ্য প্রজা, সময়ের নির্মম প্রবাহে তাঁরই উত্তরসূরিরা পরিণত হয়েছেন করুণার পাত্রে। যশোর রাজ্যের এমনই এক বিস্মৃত অথচ হৃদয়বিদারক ইতিহাস জড়িয়ে আছে কেশবপুরের মীর্জানগরের ফৌজদার নুরউল্লা খাঁর বংশের সঙ্গে।
মীর্জানগরের খ্যাতনামা ফৌজদার নুরউল্লা খাঁ ছিলেন যশোরের ইতিহাসে এক প্রভাবশালী প্রশাসক। দীর্ঘদিন তিনি ফৌজদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দৃঢ়তা, ন্যায়পরায়ণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে। তাঁর শাসনামলে মীর্জানগর পরিণত হয়েছিল এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্রে। এখান থেকে আদায় হওয়া রাজস্ব ছিল বিপুল। প্রশাসক হিসেবে যেমন তিনি ছিলেন কঠোর ও সুবিচারক, তেমনি মানবিকতায়ও ছিলেন অনন্য। মুসলমান ও হিন্দু- দুই সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিই তাঁর দানের হাত ছিল সমানভাবে প্রসারিত। পিতার মৃত্যুর চল্লিশার দিন তিনি যে বিশাল ভোজের আয়োজন করেছিলেন, তা আজও লোককথার মতো ইতিহাসে ভাস্বর।
নুরউল্লা খাঁর মৃত্যুর পর মোগল দরবার তাঁর পুত্র মীর খলিলকে ফৌজদার পদে বসানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মীর খলিল অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর পুত্র দায়েমউল্লা এবং তাঁর ভাই কায়েমউল্লার পুত্র রহমতউল্লা- দু’জনেই ছিলেন নাবালক। কে হবেন যশোরের পরবর্তী ফৌজদার, এই প্রশ্ন ঘিরেই আত্মীয়তার বন্ধন ভেঙে জন্ম নেয় বিরোধ। সেই বিরোধ ক্রমে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং নির্মম পরিণতিতে প্রাণ হারান দায়েমউল্লা ও রহমতউল্লা- দু’জনেই।
ফলে ফৌজদার বংশের বৈধ উত্তরাধিকারীরা, অর্থাৎ দায়েমউল্লার পুত্র হেদায়েতউল্লা ও কায়েমউল্লার পুত্র রহমতউল্লা, ইতিহাসের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েন। একসময় তারা আশ্রয় নেন যশোরের চাঁচড়া রাজপরিবারের করুণায়। কিছুদিন গৃহে ঠাঁই ও সামান্য ভাতা মিললেও তা স্থায়ী হয়নি। রাজকীয় ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকার বহন করেও তাঁদের জীবন ধীরে ধীরে ডুবে যায় দারিদ্র্যের অন্ধকারে।
অবশেষে অসহায় হয়ে তাঁরা আশ্রয় খুঁজতে যান ইংরেজ শাসকদের দরজায়। ১৭৯৮ সালে, বয়স যখন প্রায় আশির কোঠায়, তখন হেদায়েতউল্লা ও রহমতউল্লা যশোরের তৎকালীন কালেক্টর মি. জেমস উইনথলির কাছে সামান্য পেনশনের আবেদন জানান। তাদের আবেদনে ফুটে ওঠে এক সময়ের রাজকীয় বংশের নিঃশব্দ হাহাকার। সুপারিশসহ আবেদন পাঠানো হলে ইংরেজ সরকার দু’জনের জন্য মাসিক একশ’ টাকা করে ভাতা মঞ্জুর করে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- হেদায়েতউল্লা সেই ভাতা হাতে পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। রহমতউল্লা মাত্র চার বছর সেই ভাতা ভোগ করার সুযোগ পেয়েছিলেন, তারপর তিনিও চলে যান না-ফেরার দেশে।
পরবর্তীকালে যশোরের কালেক্টর ও ঐতিহাসিক জে. ওয়েস্টল্যান্ড তাঁর গবেষণাগ্রন্থে এই দুই ভাইয়ের আবেদনপত্র সংরক্ষণ করেন। সেই নথি আজও সাক্ষ্য দেয় ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের ক্ষণস্থায়িত্বের, আর ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুরতার।
হেদায়েতউল্লা ও রহমতউল্লা ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের কবর মীর্জানগরের মাটিতেই হলেও কালের গর্ভে তা প্রায় বিলীন। আজ কবরের কোনো নিশানাই খুঁজে পাওয়া যায় না। নুরউল্লা খাঁর কবরের পাশেই যেখানে একসময় তাঁদের ইতিহাস শায়িত ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা- কোনো সংরক্ষণ ছাড়াই হারিয়ে গেছে অতীতের স্মৃতি।
তবু সবকিছু হারিয়ে গেলেও একটি স্মৃতিচিহ্ন আজও দাঁড়িয়ে আছে। মীর্জানগরের সেই প্রাচীন কামানটি, যা বর্তমানে যশোর শহরের মনিহার সিনেমা হলের সামনে বিজয়স্তম্ভে সংরক্ষিত। সেই লোহার দেহে যেন আজও প্রতিধ্বনিত হয় ফৌজদার নুরউল্লা খাঁর ক্ষমতার পদচিহ্ন, আর শোনা যায় হেদায়েতউল্লা ও রহমতউল্লার অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস- যে ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, গভীর বেদনাও বহন করে।


























