বৃহস্পতিবার ০৫ মার্চ ২০২৬

১৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চলে গেলেন নাট্যপ্রাণ বৈদ্যনাথ সাহা 

মঞ্চই ছিল যার জীবন, অভিনয়ই যার শ্বাস

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ১৭:০৭, ৪ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ০৪:১২, ৫ মার্চ ২০২৬

মঞ্চই ছিল যার জীবন, অভিনয়ই যার শ্বাস

যশোরের নাট্যাঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম বৈদ্যনাথ সাহা। মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) বিকেলে তিনি পরলোকগমন করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন নাটকের মানুষ, মঞ্চের মানুষ। তাঁর প্রস্থান যশোরসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের নাট্যাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

১৯৫৫ সালের ১৫ আগস্ট নড়াইল জেলার অন্তরিয়া গ্রামে তার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন বৈদ্যনাথ সাহা। বাবা হিরন্ময় সাহা এবং মা মনিমালা রাণী সাহার স্নেহে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী ছিলেন নয় ভ্রাতা ও পাঁচ ভগ্নীর মধ্যে চতুর্থ। তাদের আদি নিবাস খুলনার ফুলতলার দামোদর। ব্যবসায়িক সূত্রে পরিবার যশোর শহরের চাউল বাজারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখান থেকেই তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের বিস্তার।
শিক্ষাজীবন এসএসসি পর্যন্ত হলেও সাংস্কৃতিক চর্চায় তাঁর জ্ঞান, অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা ছিল বিস্তৃত ও গভীর। ১৯৭৫ সালে যশোরের চৌগাছা উপজেলার খড়িঞ্চ গ্রামের অনিমা সাহাকে তিনি বিবাহ করেন। ১৯৯২ সালে প্রথম পত্নীর মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করলেও তিনি জীবনযুদ্ধে থেমে থাকেননি। ১৯৯৩ সালে মোড়েলগঞ্জের সুচিত্রা সাহাকে বিবাহ করে নতুনভাবে সংসার জীবন শুরু করেন।

বৈদ্যনাথ সাহার নাট্যজীবনের সূচনা ঘটে ১৯৭২ সালে। ‘শহীদ আয়ুব স্মৃতি সংঘ’-এর প্রযোজনায় কঙ্কর গুপ্ত রচিত “অগ্নিবীণার কবি” নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। একই বছরে ‘নর পিশাচ’ ও ‘জবাব দিহি’ নাটকেও তিনি অভিনয় করেন। ১৯৭৩ সালে ‘নবারুণ শিল্পী গোষ্ঠী’ ও “অনির্বাণ শিল্পী গোষ্ঠী” প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ‘রবি বাসরীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ’-এর মঞ্চে ‘মেস নং-৪৯’, ‘অগ্নিবীণার কবি’ ও ‘নতুন সূর্য’ নাটকে অভিনয় করে তিনি নাট্যপ্রেমীদের নজর কাড়েন।
পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। ১৯৭৮ সালের ‘কেনারাম বেচারাম’ থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর ‘অথঃ স্বর্গ বিচিত্রা’-তে নারদ চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। ‘জনৈকের মহাপ্রয়াণ’-এ চেয়ারম্যান, ‘অপমানিত’-এ বুদন, ‘মাইলপোষ্ট’-এ সঙ- প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজস্ব অভিনয়শৈলীর স্বাক্ষর রেখেছেন।

১৯৮১ সালে ‘ভালো মানুষ’, ‘সাজানো বাগান’, ‘এবার ধরা দাও’, ‘অরক্ষিত মতিঝিল’, ‘ওরা আছে বলেই’- একের পর এক নাটকে তার অংশগ্রহণ তাকে যশোর নাট্যাঙ্গনের অপরিহার্য মুখে পরিণত করে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০-এর দশক জুড়ে ‘ওরা কদম আলী’, ‘ক্রীতদাসের হাসি’, ‘ফাঁস’, ‘নতুন মানুষ’, ‘আজরাইলের পোষ্টমর্টেম’, ‘দোদুলদোলা’, ‘শাহজাদীর কালো নেকাব’, ‘রণ দুন্দভী’, ‘ভোরের মিছিল’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সমর্পণ’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘সুখী রমণী গুনাই বিবির কেচ্ছা’, ‘রাজা প্রতাপাদিত্য’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘কলমী ফুল’, ‘মায়াকানন’, ‘আরশি দেশের পড়শীরা’ প্রভৃতি নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন বিভিন্ন চরিত্রে। কখনও প্রধান, কখনও পার্শ্বচরিত্র- কিন্তু প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও স্বতন্ত্র।
শুধু মঞ্চেই নয়, তিনি বিটিভিতেও অভিনয় করেছেন। ‘অন্ধ নগরীর চৌপাট রাজা’, ‘নদী থেকে সমুদ্র’, ‘এ মধুর খেলা’, ‘শ্রাবণে বসন্তে’ প্রভৃতি নাটকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকমনে দাগ কেটেছে। বাংলাদেশ বেতারেও তিনি অংশ নেন ‘অন্ধ নগরীর চৌপাট রাজা’ নাটকে। নাটকের পাশাপাশি অসংখ্য বিজ্ঞাপনচিত্রেও তিনি অভিনয় করেছেন, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছেও পরিচিত করে তোলে।
অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনাতেও তিনি ছিলেন দক্ষ। ‘পাথর বাড়ী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ত্রিরত্ন’, ‘আমি’, ‘রণদুন্দভী’, ‘জীবন নাটক’ প্রভৃতি নাটকে নির্দেশনা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন- তিনি কেবল অভিনেতা নন, একজন পরিপূর্ণ নাট্যকর্মী।
বৈদ্যনাথ সাহার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়- তিনি ছিলেন নাট্যপ্রাণ। বয়সের ভার তাঁকে থামাতে পারেনি। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন। যশোর, ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি নাটকে অংশ নিয়েছেন নিষ্ঠা ও আবেগ নিয়ে। তাঁর কণ্ঠ, সংলাপ বলার ভঙ্গি, চরিত্রে ডুবে যাওয়ার ক্ষমতা- সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য শিল্পী।

২০২২ সালের শেষ দিকে একদিন ফোন করে তিনি সকালে আমার অফিসে আসলেন। বললেন, আপনি যশোরের নাট্য ব্যক্তিদের নিয়ে লেখালেখি করেন, সেটা আমার নজরে এসেছে। আমিও নাটক করি, তা কি আপনি জানেন? আমি হেসে শুধু বলেছিলাম, আপনি মারা গেলে দেখেন, আপনার পুরোনো ছবি দিয়ে আমি কি লিখি। আমি আসলে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিলাম সেদিন। কিন্তু সেদিন বুঝেনি, তিনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। তিনি হয়ত চেয়েছিলেন, আমি একদিন তাকে নিয়ে লিখি, সময়ের অভাবে তাঁর বেঁচে থাকা জীবনে লিখতে পারেনি। সেজন্য বৈদ্যনাথ সাহা দাদা’র কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার অভিনীত শত শত চরিত্র, তাঁর নির্দেশিত নাটক, তার অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা নতুন শিল্পীরা-সবকিছুতেই তিনি বেঁচে থাকবেন। যশোরের নাট্যমঞ্চে যখনই আলো জ্বলবে, সংলাপ ধ্বনিত হবে, তখনই স্মরণে আসবে এই নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর নাম- বৈদ্যনাথ সাহা।

তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

 

 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: