বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার শ্রীধাম লক্ষীখালীতে শুরু হয়েছে গোপাল চাঁদ সাধু ঠাকুরের ১০৪তম ঐতিহ্যবাহী বারুণী স্নানোৎসব ও মতুয়া মহামেলা। তিন দিনব্যাপী এই ধর্মীয় আয়োজনকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও বিদেশ থেকে আগত ভক্তদের মিলনে এক মহামিলনমেলায় পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা।
সোমবার (৩০ মার্চ) ভোর থেকে ত্রয়োদশী তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী মতুয়া সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ভক্ত শ্রীধাম লক্ষীখালীতে সমবেত হন। পাপ মোচন ও পারমার্থিক কল্যাণ লাভের আশায় ‘কামনা সাগরে’ পূণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই মহোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। দিনভর ভক্তদের পদচারণায় মেলার মাঠ মুখরিত হয়ে ওঠে। নিশান, ডাঙ্গা ও ঢোলের বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে হরিনামে মেতে ওঠেন ভক্তরা, যা পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক আবহে ভরিয়ে তোলে। ভক্তরা স্নানের মাধ্যমে নিজেদের পাপ মোচন করে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করেন।
মেলার আয়োজক ও শ্রীধাম লক্ষীখালীর বর্তমান গদীনশিন সেবাইত সাগর সাধু ঠাকুর জানান, পূর্ণব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিগুরু চাঁদ ঠাকুরের ২১৫তম জন্মজয়ন্তী স্মরণে বাংলা ১৩২৮ সাল থেকে এই মেলার সূচনা। সেই থেকে প্রতিবছর একই তিথিতে লক্ষীখালী গ্রামে তার ভক্ত শ্রী শ্রী গোপাল চাঁদ সাধু ঠাকুরের লীলাধামে এই মহামেলার আয়োজন হয়ে আসছে। যা বর্তমানে ‘গোপাল সাধুর মেলা’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
তিনি আরও জানান, এ বছরের মেলায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রায় চার শতাধিক ভক্তদল অংশগ্রহণ করেছে। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটান থেকে আগত ভক্তদের উপস্থিতি মেলাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। লাখো ভক্ত একত্রিত হয়ে ধর্মীয় এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছেন।
মেলাকে ঘিরে বসেছে নানা ধরনের দোকানপাট। গৃহস্থালি সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, মিষ্টান্ন, অলংকারসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে করে মেলাটি শুধু ধর্মীয় আয়োজনেই সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আগত দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মেলাটি এখন এক প্রাণচঞ্চল জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে।
উল্লেখ্য, গোপাল চাঁদ সাধু ঠাকুরের এই লীলানিকেতন ওড়াকান্দির ঐতিহাসিক বারুণী স্নানের প্রায় ১৫ দিন পর অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ওড়াকান্দি থেকে আগত বহু ভক্তও এই মেলায় অংশ নেন, যা এই আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে প্রশাসনও রয়েছে তৎপর। মোরেলগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদুর রহমান জানান, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় বাগেরহাট থেকে লক্ষীখালী পর্যন্ত অন্তত ৪ থেকে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোবাইল পুলিশ টিম মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন, যাতে করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
সব মিলিয়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও উৎসবের আনন্দে শ্রীধাম লক্ষীখালীর বারুণী স্নানোৎসব ও মতুয়া মেলা এখন পরিণত হয়েছে এক অনন্য ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলায়, যা প্রতিবছর লাখো ভক্তের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে নেয়।


























