কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মুন্সীপাড়া এলাকা। দিগন্তজোড়া সবুজ আর পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকার কথা ছিল যে উদ্যান, সেখানে আজ কেবলই শ্মশানের নীরবতা। তিন বিঘা জমিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত কঙ্কালসার মৃত পেয়ারা গাছ। দিনমজুর থেকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর কৃষক আতাউল্লাহর ২০ লাখ টাকার স্বপ্ন এখন মাটির সাথে মিশে ছাই। আর এই সুপরিকল্পিত ধ্বংসলীলার নেপথ্যে উঠে এসেছে একটি বহুজাতিক কোম্পানির ‘হরমোন-সন্ত্রাস’ ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা।
গত ২০ শ্রাবণ। সেঞ্চুরি এ্যাগ্রো লিঃ-এর এরিয়া ম্যানেজার মেহেদী হোসেন অধিক ফলনের প্রলোভন দেখিয়ে আতাউল্লাহকে প্রলুব্ধ করেন তাদের প্যাকলোবিউট্রাজল উপাদান সমৃদ্ধ হরমোন ‘টনটন’ ব্যবহারে। অভিজ্ঞ কৃষক আতাউল্লাহ বারবার ডোজ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়। যেখানে ১০ এমএল প্রয়োগই যথেষ্ট, সেখানে কোম্পানির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সরাসরি গাছের গোড়ায় ঢেলে দেওয়া হয় ৫০ এমএল বিষ। ফলশ্রুতিতে পহেলা আশ্বিন থেকেই শুরু হয় মড়ক। সতেজ গাছগুলো মুহূর্তেই রূপ নেয় একেকটি মৃত কাঠে।
পেয়ারা বাগান ধ্বংসের পর শুরু হয় কোম্পানির নতুন নাটক। প্রথমে ‘গাছের বয়স’ আর পরে ‘ভাইরাস’- নানা অজুহাতে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলে। তবে আতাউল্লাহর হাতে থাকা অডিও-ভিডিও রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা। এরিয়া ম্যানেজার মেহেদী হাসান স্বীকার করেছেন তাদের নির্দেশনার ভুল। কিন্তু ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মাত্র কয়েকশ চারা কিনে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন তিনি, যা এক ‘নিষ্ঠুর রসিকতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো : মিরপুর ও ভেড়ামারা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা সশরীরে বাগান পরিদর্শন করে অতিরিক্ত ডোজের প্রমাণ পেয়েছেন। তবুও অজানা কারণে রহস্যময় নীরবতা পালন করছে কৃষি বিভাগ। অভিযোগ উঠেছে, কোম্পানির প্রভাবশালী মহলের সাথে মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার ‘গোপন আঁতাত’ রয়েছে। ফলে একজন কৃষকের ২০ লাখ টাকার সম্পদ ধ্বংস হওয়া সত্ত্বেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে ‘সেঞ্চুরি এ্যাগ্রো’।
কান্নাভেজা চোখে আতাউল্লাহর প্রশ্ন- ‘আমার সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ, ঋণের কিস্তিতে আমি দিশেহারা। কোম্পানি শিক্ষিত অফিসারদের কথায় বিশ্বাস করা কি আমার অপরাধ ছিল?’ আতাউল্লাহর এই দীর্ঘশ্বাস আজ কুষ্টিয়ার কৃষি খাতের এক বিরাট লজ্জা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শওকত হোসেন ভূঁইয়া লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় আছেন। অথচ তার মাঠ কর্মকর্তারা সব জেনেও কেন এখনো নীরব, সেই প্রশ্ন এখন স্থানীয় সচেতন মহলের মুখে মুখে।
সেঞ্চুরি এ্যাগ্রো লি.-এর ম্যানেজার (প্রোডাক্ট ডেভলপমেন্ট) ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, পেয়ারা বাগান ক্ষতিগ্রস্তের কথা জানতে পেরে আমরা কোম্পানির রাজশাহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কৃষিবিদ পাঠিয়েছিলাম। তিনি সরেজমিনে দেখেছেন, উপজেলা কৃষি অফিসারের সাথেও কথা বলে এসেছেন। সে সময় ওই কৃষকের সাথে কথা হয়েছিল, ওই প্রোডাক্ট দিয়ে কৃষি অফিস এবং কোম্পানি আলাদা আলাদাভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ট্রায়াল দেবে। যদি ডোজের কারণে এমনটা হয় তখন প্রোডাক্টের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কোম্পানির একই প্রোডাক্ট সারাদেশে ব্যবহার হচ্ছে, কোথাও এ ধরনের অভিযোগ আসেনি। তিনি মনে করেন, এটা ডোজের জন্য হয়নি, বরং গাছের বয়স, পরিচর্যাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা দায়ী। তিনি এ বিষয়ে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে, আগে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সাথে পরামর্শ করার অনুরোধ জানান।


























