‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’Ñপ্রবাদটির বাস্তব উদাহরণ যেন ঝিনাইদহের শৈলকূপা মিনি মৎস্য হ্যাচারি। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে হ্যাচারিটির রেণু উৎপাদন কার্যক্রম। অথচ সরকারি নথিতে চলতি বছরও সেখানে ৩৭ কেজি রেণু উৎপাদনের তথ্য দেখানো হয়েছে। এ বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। শুধু তাই নয়, গত তিন বছরে হ্যাচারিটির বিভিন্ন খাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে হ্যাচারিটিতে কোনো উৎপাদন কার্যক্রমের দেখা মেলেনি।
মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে শৈলকূপা উপজেলা শহরের কোর্টপাড়ায় নির্মাণ করা হয় মিনি মৎস্য হ্যাচারিটি। দীর্ঘদিন অচল থাকায় বর্তমানে স্থাপনাটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। হ্যাচারির অফিস কক্ষেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন দুই বছর আগে অবসরে যাওয়া এক কর্মচারী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে হ্যাচারিটিতে কোনো রেণু উৎপাদন হয়নি। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর সেখানে ৩৭ কেজি রেণু উৎপাদন হয়েছে। এর বিপরীতে খরচ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ফলে সরকারি নথিতে দেখানো উৎপাদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে হ্যাচারিতে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম আমরা দেখতে পাইনি। হ্যাচারিটি চালু হলে এলাকার মাছচাষিরা উপকৃত হতেন। কিন্তু এতদিন বন্ধ থাকার পরও যদি সরকারি কাগজে উৎপাদন দেখানো হয়, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করা দরকার।’
আরেক বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘হ্যাচারিটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত উৎপাদন হলে এখানে কর্মচাঞ্চল্য থাকার কথা। অথচ বাস্তবে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। সরকারি অর্থ কোন খাতে কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে হ্যাচারিটির সংস্কার, শ্রমিক মজুরি, মৎস্যখাদ্য, কম্পিউটার সামগ্রীসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অর্থ কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে উৎপাদন কার্যক্রম না থাকলেও কাগজপত্রে উৎপাদন দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ঘটনা ঘটছে। তারা হ্যাচারিটির বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ঝিনাইদহ সিপিবির সভাপতি স্বপন বাগচি বলেন, ‘সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ। কোনো প্রকল্প কার্যকর না থাকলে সেখানে বছরের পর বছর অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। হ্যাচারিটির বরাদ্দ, ব্যয় এবং কাগজে দেখানো রেণু উৎপাদনের বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র বের করা প্রয়োজন।’
এদিকে সরকারি নথিতে রেণু উৎপাদনের তথ্য থাকার বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, ‘হ্যাচারিটিতে নতুন করে রেণু উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ তবে গত কয়েক বছরে হ্যাচারিটির জন্য কী পরিমাণ বরাদ্দ এসেছে এবং কীভাবে তা ব্যয় হয়েছেÑএ বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮২ সালে নির্মাণের পর হ্যাচারিটির কার্যক্রম ১৯৮৬ সালের দিকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৫ সালে মৎস্য বিভাগ আবারও কিছুদিনের জন্য রেণু উৎপাদন কার্যক্রম চালু করে। কিন্তু জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে হ্যাচারিটির সব কার্যক্রম।
একদিকে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম নেই, অন্যদিকে সরকারি নথিতে রেণু উৎপাদনের তথ্য এবং বিভিন্ন খাতে বরাদ্দÑএমন পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হ্যাচারিটির গত কয়েক বছরের বরাদ্দ, ব্যয় ও কাগজে দেখানো রেণু উৎপাদনের তথ্য তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


























