সোমবার ৩১ আগস্ট ২০২৬

১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষকের ঘরে বীজ নেই, বাড়ছে বাজারনির্ভরতা

বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষি

বসির আহাম্মেদ, ঝিনাইদহ

প্রকাশিত: ১৫:১১, ৩০ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৫:১২, ৩০ আগস্ট ২০২৬

বীজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝুঁকিতে কৃষি

একসময় কৃষকের গোলাভরা ধানের পাশে মাটির মটকা, বাঁশের গোলা কিংবা ঘরের চালে যত্ন করে রাখা থাকত পরের মৌসুমের বীজ। ভালো ফসল থেকে বাছাই করা সেই বীজেই শুরু হতো নতুন মৌসুমের চাষ। বীজ ছিল কৃষকের নিজের সম্পদ, নিজের নিরাপত্তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। কৃষকের ঘরের বীজের জায়গা নিয়েছে বাজারের প্যাকেট। নিজের বীজ হারিয়ে কৃষক ক্রমেই হয়ে পড়ছেন বাজারনির্ভর।

ঝিনাইদহের মাঠে এখন সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী মৌসুমের বীজের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই। সরকারি সরবরাহ সীমিত হওয়ায় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও স্থানীয় বাজার থেকে। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে কোনো কারণে বাজারে বীজ সরবরাহ ব্যাহত হলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন কৃষকেরা। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষির বৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও।
চড়া দামে বেসরকারি বীজ
শৈলকুপা উপজেলার হাজরামিনা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হাশেম হোসেন চলতি মৌসুমে ৩৫ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। সরকারি বীজ পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলারের কাছে ঘুরেও প্রত্যাশিত বীজ পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে বেসরকারি কোম্পানির প্যাকেটজাত হাইব্রিড বীজ কিনে বীজতলায় দেন। সেই বীজ থেকে উৎপাদিত চারাই এখন তাঁর জমিতে রোপণ করা হয়েছে।
একই উপজেলার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক মসলেম উদ্দিনের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। তাঁর হাতে পাওয়া বীজের একটি অংশে অঙ্কুরোদগম হয়নি। তিনি বলেন, ‘একসময় ধান কাটার পর ভালো ধান আলাদা করে বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হতো। মাটির মটকা কিংবা গোলায় যত্ন করে রাখা সেই বীজ দিয়েই পরের বছর চাষ করা সম্ভব ছিল। এখন সেই নিশ্চয়তা নেই। প্রতি মৌসুমে বীজের জন্য বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।’
বাড়ছে বেসরকারি নির্ভরতা
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ঝিনাইদহে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে বিএডিসি উফশী বীজের প্রায় ১৯ শতাংশ এবং হাইব্রিড বীজের প্রায় ১ শতাংশ সরবরাহ করে। অর্থাৎ বীজের চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে বেসরকারি কোম্পানি ও বাজারের মাধ্যমে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর আগে জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক নিজেদের উৎপাদিত ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমের বীজ সংরক্ষণ করতেন। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অধিকাংশ কৃষকই বিভিন্ন কোম্পানি ও বাজার থেকে বীজ কিনে চাষ করছেন।
ঝিনাইদহের বীজের বাজারে লাল তীর, এসিআই, বায়ারসহ বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বীজ রয়েছে। সরকারি সরবরাহ চাহিদার তুলনায় সীমিত হওয়ায় কৃষকদের বড় একটি অংশকে বেসরকারি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ
উচ্চফলনের আশায় কৃষকের মধ্যে হাইব্রিড বীজের ব্যবহারও বাড়ছে। কিন্তু হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসল থেকে পরবর্তী মৌসুমে একই মান ও বৈশিষ্ট্যের বীজ সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যায় না। ফলে প্রতি মৌসুমেই নতুন বীজ কেনার প্রয়োজন হয়।
এতে কৃষকের বীজের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আরও কমে যাচ্ছে। কৃষকের হাতে জমি থাকলেও চাষের অন্যতম প্রধান উপকরণ বীজের জন্য তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে বাজারের ওপর।
শৈলকুপার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, ‘আগে ধান কাটার সময় ভালো ধান আলাদা করে রেখে দিতাম। পরের মৌসুমে ওই ধান থেকেই বীজ তৈরি করে চাষ করতাম। এখন কোম্পানির বীজ কিনতে হয়। নিজের বীজ রাখার অভ্যাসও অনেকটা চলে গেছে।’
হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় জাত
বীজের বাজারনির্ভরতার পাশাপাশি ঝিনাইদহে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী জাতের বীজ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে।
একসময় বিভিন্ন মৌসুমে ধানের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি, ডালের ২২ থেকে ২৫টি এবং সবজির প্রায় ৩০টি জাতের চাষ হতো। বর্তমানে ধানের জাত বেড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি, ডালের ৩২ থেকে ৩৫টি এবং সবজির জাত ৫৫ থেকে ৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে জাতের সংখ্যা বাড়লেও অনেক স্থানীয় জাতের চাষ ও সংরক্ষণ কমে গেছে।
ঝিঙাশাইল, লতিশাইল, কাটারিভোগ, রাজাশাইল, দুধকলম, বাঁশফুল, রূপশাইল, দিঘাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধানের জাত বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়। একইভাবে দেশি খেসারি, স্থানীয় লাল মুগ, মাষকলাই, মাঘী সরিষা, তিলসহ বিভিন্ন স্থানীয় সবজির জাতও আগের তুলনায় কম চাষ হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জাত শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়; এগুলো কৃষকের ঝুঁকি মোকাবিলারও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একাধিক জাতের বীজ কৃষকের হাতে থাকলে কোনো একটি জাত রোগ, পোকামাকড় বা বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য জাত দিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার সুযোগ থাকে। বিপরীতে সীমিত কয়েকটি বাণিজ্যিক জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৃষিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
মনোহরপুর গ্রামের কৃষক সিজার জিকরুল বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ পাওয়া যায়। বিক্রেতারা ভালো ফলনের কথা বলে বীজ দেন। কিন্তু বীজ ভালো না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। বীজের সঙ্গে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের খরচও জড়িয়ে থাকে।’

কালীগঞ্জের কৃষক বসির আহমেদ বলেন, ‘নিজের ঘরে বীজ মজুদ থাকলে চাষাবাদের খরচ অনেকটা কমে যায়। তাতে কৃষক লাভবান হন। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না। বীজ কিনতে গিয়ে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে।’
বীজ ব্যাংকের প্রয়োজন বাড়ছে
শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমানের অভিজ্ঞতাতেও সরকারি বীজ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী দেখে নতুন জাতের ধান চাষ করে ভালো ফলন পাওয়ার পর পরের বছর সেই জাতের বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারি বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা শুনতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে বেসরকারি বীজ কিনতে হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, কৃষক পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও এর আওতা এখনো সীমিত। ফলে অধিকাংশ কৃষক এ সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
এ অবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ে বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা, কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মতভাবে বীজ সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং বিএডিসির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকদের মানসম্মত বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদিত ভালো ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ভালো ও রোগমুক্ত জমি থেকে উপযুক্ত সময়ে বীজ সংগ্রহ করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নিজের বীজ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে একদিকে বীজ কেনার খরচ কমবে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।’

কৃষকদের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসলের সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করানো হচ্ছে। ভালো ফলন পাওয়া গেলে কৃষকদের নিজেদের জমির উপযোগী বীজ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বীজ সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি ভালোভাবে শুকানো, রোগমুক্ত রাখা এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: