সোমবার ৩১ আগস্ট ২০২৬

১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষি পরামর্শ

খরা ও অতিবৃষ্টি জয় করে আমন চাষে সফলতার উপায়

রানার কৃষি

প্রকাশিত: ১৫:৩২, ৩০ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ১৭:২০, ৩০ আগস্ট ২০২৬

খরা ও অতিবৃষ্টি জয় করে আমন চাষে সফলতার উপায়

আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আমন চাষে এখন কখনো খরা, আবার কখনো অতিবৃষ্টির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষককে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সঙ্গে বাড়ছে রোগ-পোকার আক্রমণও। ফলে ভালো ফলনের জন্য শুধু জমি ও বীজ প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উপযোগী জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ। খরা ও অতিবৃষ্টির মতো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমনের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে কৃষকের করণীয় নিয়ে রানার কৃষির নিয়মিত আয়োজনে পরামর্শ দিয়েছেন চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শস্যভাণ্ডার যশোর। এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির প্রাণ রোপা আমন ধান। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক খরা, অতিবৃষ্টি, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও সুষম সারের অভাবে অনেক কৃষকই কাক্সিক্ষত ফলন পাচ্ছেন না। জলবায়ুর পরিবর্তনকে মাথায় রেখে চলতি মৌসুমে কিছু কৌশল মেনে চললে খরা ও অতিবৃষ্টি দুটোই মোকাবিলা করে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
অনাবৃষ্টি ও সম্পূরক সেচ
আমন ধানের জীবনচক্রে দুটি সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো চারা রোপণের পর গাছের শিকড় স্থাপনের সময়, অন্যটি কাইচ থোড় আসার সময়। এ দুই সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে জমি শুকিয়ে গিয়ে ফলন কমে যেতে পারে।
এ সময় জমি কোনোভাবেই ফেটে যাওয়া পর্যন্ত শুকাতে দেওয়া যাবে না। বৃষ্টি না হলে দ্রুত হালকা সম্পূরক সেচ দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ২-৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখা যেতে পারে। অল্প পানিতে বারবার সেচ দিলে পানির অপচয়ও কম হবে।
মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ
ইউরিয়া সার বেশি দিলে ধানগাছ অতিরিক্ত সবুজ ও কোমল হয়ে যায়। এতে মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রথমেই পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। একে বলা হয় ‘পার্চিং’। প্রতি বিঘা জমিতে ৪-৫টি উঁচু বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে দিতে হবে। পাখিরা এসব কঞ্চিতে বসে মাঠের ক্ষতিকর পোকা খাওয়ার সুযোগ পাবে।
পোকার আক্রমণ বেশি হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওষুধের সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগের সময় মেনে চলা জরুরি। অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়।
খোল পচা ও পাতা পোড়া রোগ
বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং অপরিকল্পিতভাবে ইউরিয়া প্রয়োগ করলে ধানে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। খোল পচা ও পাতা পোড়া রোগের ক্ষেত্রেও সুষম সার ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ইউরিয়ার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পটাশ, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান দিতে হবে। রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগ শনাক্ত করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।
উচ্চ ফলনের জন্য সঠিক জাত নির্বাচন
সময় বদলেছে, তাই জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। জমির ধরন, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় আবহাওয়া এবং ফসল কাটার সময় বিবেচনা করে জাত নির্বাচন করা প্রয়োজন।
উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫ ও ব্রি ধান৯০ উল্লেখযোগ্য। খরা ও প্রতিকূলতা সহনশীল জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান১০৩, বিনাধান-১৭, বিনাধান-২০, বিনাধান-২২ ও বিনাধান-২৩।
এসব জাতের একটি বড় সুবিধা হলো অনেক জাত তুলনামূলকভাবে দ্রুত পাকে। ফলে আমন কাটার পর দ্রুত সরিষা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন রবি ফসল চাষের সুযোগ পাওয়া যায়। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষ করা গেলে কৃষকের আয়ও বাড়তে পারে।
সুষম সার ও মাটির স্বাস্থ্য
শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলন ধরে রাখা সম্ভব নয়। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জমি তৈরির সময় গোবর বা অন্যান্য জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বোরো ধান কাটার পর জমিতে ধৈঞ্চা বুনে ৪৫-৫০ দিন পর তা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া যায়। এটি সবুজ সার হিসেবে মাটির জৈব পদার্থ ও উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। এর ফলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনও কমতে পারে।
শেষ চাষের সময় মাটির পরীক্ষা ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে।
ইউরিয়া সার একসঙ্গে প্রয়োগ করা যাবে না। কয়েক কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সাধারণভাবেÑপ্রথম কিস্তি: চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর। দ্বিতীয় কিস্তি: কাইচ থোড় আসার ১৫-২০ দিন আগে। তৃতীয় কিস্তি: থোড় বের হওয়ার সময়। তবে জমির উর্বরতা, ধানের জাত ও স্থানীয় কৃষি সুপারিশ অনুযায়ী সারের মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
বিজ্ঞানসম্মত পানি ব্যবস্থাপনা
কাইচ থোড় আসা থেকে দানায় দুধ আসা পর্যন্ত সময়ে ধানগাছের পানির চাহিদা বেশি থাকে। এ সময় জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করতে হবে। 
তবে জমিতে সবসময় অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা ঠিক নয়। অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকলে ধানের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।
ধান কাটার ১০-১২ দিন আগে জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া ভালো। এতে জমি কিছুটা শুকিয়ে আসে, ধান কাটতে সুবিধা হয় এবং ফসল সংগ্রহের সময়ও কমে।
নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ
আমন চাষে সফলতার অন্যতম শর্ত হলো নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ। আগাছা, পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাই কৃষকদের নিয়মিত জমি দেখতে হবে। পোকামাকড় দেখা দিলেই অযথা কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রথমে পোকার ধরন ও আক্রমণের মাত্রা শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।
সময়মতো আগাছা দমন, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, পার্চিং, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ—এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও আমনের ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

কৃষক ভাই ও বোনেরা, আমন ধানের জমিতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত আপনার এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সমস্যার কথা জানান এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন।
সবাই ভালো থাকুন।
 

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: