কুষ্টিয়ার বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক নারী বাড়ির আঙিনায় কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে আয় করছেন। নিজেদের জমি ও বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত সবজিতে এই সার ব্যবহারের পাশাপাশি বাড়তি সার বিক্রি করছেন তাঁরা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতায় একজনের হাত ধরে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের শতাধিক নারীর মধ্যে।
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে বিত্তিপাড়া বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে আধা কিলোমিটার গেলেই বিত্তিপাড়া গ্রাম। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির আঙিনায় সারি করে রাখা সিমেন্টের চাকে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট। গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল ব্যবহার করে তৈরি এ সার নিজেদের ফসল উৎপাদনে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করছেন নারীরা।
বিত্তিপাড়া গ্রামে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন গৃহবধূ জাহানারা খাতুন। ২০২১ সালে বাড়ির আঙিনায় দুটি সিমেন্টের চাক বসিয়ে তিনি গোবর ও কেঁচো দিয়ে জৈব সার তৈরি শুরু করেন। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতাও নেন তিনি।
এখন তাঁর বাড়ির পেছনের টিনশেডে ৪০টি এবং বাড়ির সামনে আরও ১০টি চাক রয়েছে। নিজের গরুর গোবরের পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করেন। এর সঙ্গে সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল মিশিয়ে তৈরি করেন সার।
জাহানারা খাতুন বলেন, ‘কেঁচো সারেই আমাদের জীবন বদলে গেছে। কয়েক বছর আগেও বাড়িতে ছাপড়া ছিল। সেখানে দালান তুলেছি। গরু-ছাগল পালছি। সামান্য জমি আছে। সেখানে যা ধান হয়, তা দিয়ে আমাদের চলে যায়। তা ছাড়া বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ফলাই। সরকারি নানা সহযোগিতা পেয়ে এতদূর এসেছি। আমার দেখাদেখি গ্রামের অনেক নারী এখন জৈব সার তৈরি করছেন। তারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।’
জাহানারা খাতুন জানান, প্রতিটি সিমেন্টের চাক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দিয়ে কেনা হয়। এতে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল দেওয়ার পর কেঁচো ছাড়া হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন চাক ঢেকে রাখার পর তৈরি হয় জৈব সার। এ সময় মাঝে মাঝে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়।
প্রতিটি চাক থেকে প্রায় ৩০ কেজি সার পাওয়া যায়। বর্তমানে মাসে প্রায় ৪০ মণ সার উৎপাদন করছেন জাহানারা। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে বিক্রি করলে মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকার সার উৎপাদন হয়। এর মধ্যে দুই থেকে তিন মণ নিজেদের জমিতে ব্যবহার করেন। বাকিটা বিক্রি করেন।
বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাড়ি থেকে সার কিনে নিয়ে যান।
বিত্তিপাড়া গ্রামের নারীরা শুধু সার বিক্রি করছেন না, নিজেদের উৎপাদিত সার দিয়ে বাড়ির আঙিনা ও কৃষিজমিতে সবজি চাষও করছেন।
রিনা পারভীন ও নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, ‘বিত্তিপাড়া গ্রামে সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়। জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন নারীরা। প্রথমত নিজেদের ফসলের জমিতে এই সার ব্যবহার করা হয়। বাড়তি সার বিক্রি করে কিছু টাকা আয় হয়। সংসারের কাজে লাগে।’
মনিরা খাতুন বলেন, গ্রামের বাসিন্দারা আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। জৈব সার দিয়ে বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ধান, ভুট্টা ও শসার ক্ষেতেও এই সার ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তা নারীরা জানান, জৈব সার বিক্রির অর্থ দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলের পোশাকসহ পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন তাঁরা। সার তৈরিতে স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণ ব্যবহার হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কম।
বিত্তিপাড়া ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘পুরুষেরা অনেক সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। কিন্তু নারীরা বাড়িতে থেকে নানা কাজ করেন। তাই জৈব সার উৎপাদনের জন্য নারীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে সুবিধা পাওয়ায় নারীরা এখন নিজেরাই জৈব সার উৎপাদন করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এখন তারা এই সারের উপকারিতা বিষয়ে সচেতন।’
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, ‘আমি একজন নারী। এতে নারীদের সঙ্গে মিশতে সহজ হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার টিমের সদস্যরা নারীদের কী প্রয়োজন, সেটা জেনে মেটানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই গ্রামে একজন থেকে শুরু করে এখন শতাধিক নারী জৈব সার উৎপাদন করছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় সাফল্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রণোদনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। প্রায় প্রতি বাড়িতে বস্তায় সবজি উৎপাদনের জন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তা ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলের গাছ বিতরণ করা হচ্ছে। নারীরা যাতে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারেন এবং এই সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন, সে জন্য আমাদের এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
জাহানারা খাতুনের শুরু করা উদ্যোগ এখন বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক নারীর বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। নিজেদের ফসল উৎপাদনে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সার বিক্রি করে সংসারে অর্থ যোগ করছেন তাঁরা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।


























