বুধবার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আর এম মঞ্জুরুল আলম টুটুলের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

‘দৈনিক রানার’ ও তিন প্রজন্মের আত্মত্যাগ

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ২২:২৬, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২২:৪০, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

‘দৈনিক রানার’ ও তিন প্রজন্মের আত্মত্যাগ

যশোরের সংবাদপত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে ‘দৈনিক রানার’-এর নাম উচ্চারণ না করে উপায় নেই। এক সময় যশোরাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি সার্কুলেশনের পত্রিকা ছিল এটি। আজ যশোরের যেসব বরেণ্য সাংবাদিক নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাঁদের অনেকের হাতেখড়ি হয়েছিল এই পত্রিকায়। ‘দৈনিক রানার’ ছিল সে সময় —একটি চেতনা, একটি প্রতিবাদের ভাষা, একটি সাহসী উচ্চারণ।
এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক গোলাম মাজেদ ছিলেন সেই উচ্চারণের মুখ। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের অমানুষিক নির্যাতনে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। অসুস্থতা চরমে পৌঁছালে এরশাদ সরকার “হত্যার দায় এড়াতে” ১৯৮৪ সালের ৫ এপ্রিল তাঁকে মুক্তি দেয়। ৭ এপ্রিল রাত সাড়ে তিনটায় তিনি সিলেট থেকে যশোরে পৌঁছান—এক ভগ্নদেহ, কিন্তু অবিচল মন নিয়ে।
মাত্র পাঁচ দিন। এতটুকুই সময় পেলেন তিনি।
১০ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে তাঁর বুকে শুরু হয় প্রচণ্ড যন্ত্রণা। শরীরের তাপমাত্রা ক্রমে কমতে থাকে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসক বন্ধু ডা. রবিউল হকের পরামর্শে তাঁকে যশোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা চার ঘণ্টা অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়েও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সেদিনের যশোর প্রস্তুত ছিল অন্য এক আয়োজনের জন্য। কোতয়ালী থানা চত্বরের চৌরাস্তায় মঞ্চ সাজানো হয়েছিল—স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-জনতা সাংবাদিক গোলাম মাজেদকে সংবর্ধনা জানাবে। কিন্তু সংবর্ধনার আগে এসে পৌঁছায় অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদ—গোলাম মাজেদ আর নেই।
মুহূর্তে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
১০ এপ্রিল ’৮৪’র সেই মঞ্চে জীবিত গোলাম মাজেদের পরিবর্তে উপস্থিত হন তাঁর নিথর দেহ। স্বামীর মৃতদেহ সামনে রেখে বক্তব্য দেন ‘দৈনিক রানার’-এর প্রকাশিকা রাবেয়া খাতুন। তাঁর কণ্ঠে ছিল বেদনা, কিন্তু ভাঙন ছিল না। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকার পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিক গোলাম মাজেদকে হত্যা করেছে। তিনি বিচার চান জনতার কাছে। সেদিন যশোরের ছাত্র-জনতা শপথ নিয়েছিল—খুনি এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সময় গড়ায়। সংগ্রাম অব্যাহত থাকে।
১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছিল ‘দৈনিক রানার’। পরদিন পত্রিকার হেডপিস ছাপা হয় উল্টোভাবে—শোক ও প্রতিবাদের এক প্রতীকী ভাষা। আর হেডপিসের জায়গায় লিড নিউজের শিরোনাম:
“গোলাম মাজেদের খুনী এরশাদ শাহীর পতন।” এ যেন কাগজের পাতায় ন্যায়বিচারের আর্তনাদ।
গোলাম মাজেদের পর পত্রিকার হাল ধরেন তাঁর পুত্র সাইফুল আলম মুকুল। পিতার উত্তরাধিকার কেবল একটি পত্রিকার দায়িত্ব নয়—একটি সংগ্রামী আদর্শের ভারও ছিল তাঁর কাঁধে। কিন্তু নির্মম ভাগ্য তাঁকেও রেহাই দেয়নি। ১৯৯৮ সালের ৩১ আগস্ট যশোরের সন্ত্রাসীদের হাতে তিনি নিহত হন। ‘দৈনিক রানার’ আবারও রক্তাক্ত হয়।
এরপর দায়িত্ব নেন আরেক পুত্র—আর এম মঞ্জুরুল আলম টুটুল।
টুটুল ছিলেন প্রাণবন্ত, সহজ-সরল এবং সৃজনশীল মানুষ। তাঁর কণ্ঠ ছিল অপূর্ব। গান গাইতেন মন ভরে। যশোরের বহু মানুষ তাঁর গানের প্রেমিক ছিলেন। সংবাদপত্রের কঠিন বাস্তবতার ভেতরেও তিনি বয়ে বেড়াতেন এক কোমল সুর। পত্রিকার দায়িত্ব পালন করতেন নিষ্ঠায়, আর মানুষকে ছুঁয়ে যেতেন তাঁর কণ্ঠে।
কিন্তু নিয়তির নির্মমতা এখানেই থামেনি। ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ‘দৈনিক রানার’-এর ইতিহাসে যুক্ত হয় আরেকটি শোকের অধ্যায়।
একটি পত্রিকার ইতিহাস এমন রক্তে লেখা হয় না সহজে। ‘দৈনিক রানার’-এর পাতায় মুদ্রিত হয়েছে সংবাদ, প্রতিবাদ, মানুষের কথা। আর তার পেছনে রয়েছে তিন প্রজন্মের আত্মত্যাগ—গোলাম মাজেদের কারাবরণ ও মৃত্যু, সাইফুল আলম মুকুলের নির্মম হত্যাকাণ্ড, আর মঞ্জুরুল আলম টুটুলের অকাল প্রয়াণ। টুটুলের মৃত্যুবার্ষিকীতে মনে পড়ে যায় সেই উল্টো হেডপিসের দিনটি, সেই সংবর্ধনা মঞ্চের কান্না, সেই হাসপাতালের ভিড়। মনে হয়, একটি পত্রিকা কেবল খবর ছাপে না—ইতিহাসও রচনা করে। আর কখনও কখনও সেই ইতিহাস লেখা হয় রক্ত, অশ্রু ও অদম্য সাহস দিয়ে।
আর এম মঞ্জুরুল আলম টুটুলের আত্মার শান্তি কামনা করি।
গোলাম মাজেদ ও সাইফুল আলম মুকুলের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কলম কখনও শুধু কালি দিয়ে নয়, কখনও কখনও জীবন দিয়েও লিখতে হয়।

 

শেয়ার করুনঃ