প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর জনসভায় যশোরের মানুষের সমস্যা ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলো সাবলীল ও কৌশলীভাবে উপস্থাপন করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে যে প্রত্যাশা ও দাবির কথা উঠেছিল, সেগুলো তিনি সুচারুভাবে তুলে ধরেন। তার এই উপস্থাপনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, তিনি যেন নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকেই যশোরবাসীর দাবিগুলো তুলে ধরেছেন।
সমাবেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছেনÑমাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি কী? আমরা কী প্রত্যাশা করছি? আমি সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিইনি। কারণ, আজ আমি কোনো দাবির রাজনীতি করতে চাই না। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করেছি, যশোরে আমাদের ৬৮ জন নেতা-কর্মী শহিদ হয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। তাই আজ দাবির ভাষায় নয়, দায়িত্ববোধ থেকে যশোরের প্রয়োজনগুলো বিনয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরছি।’
তিনি বলেন, ‘১৯ বছর যাবত ফ্যাসিস্ট ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জমানায় যশোরের প্রান্তিক পর্যায়ে গ্রামীণ কোন অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। পাকা রাস্তা থেকে গ্রামের কোন একটি রাস্তায় কয়েক কদম হেঁটে যাওয়া হয় এই রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। যশোর পৌরসভা, যে পৌরসভায় আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যে পৌরসভায় আমি পড়ালেখা করেছি সেই পৌরসভা একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে তলিয়ে যাবেÑএটি কোন দিন ভাববার সুযোগ হয়নি। অথচ আজ অল্প বৃষ্টিতে যশোর পৌরসভা জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়ে যায়।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার মণিরামপুর, আমার কেশবপুর, আমার অভয়নগর ও আমার সদর উপজেলার কিছু এলাকায় বর্ষাসহ সারাবছর ভবদাহের জলবদ্ধতায় মানুষ কষ্ট পায়। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকে বঞ্চিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ওই এলাকার মানুষের জন্য হৃদয় উজাড় করে চেষ্টা করেছিলেন কষ্ট লাঘবের জন্য।’
তিনি বেনাপোল স্থলবন্দরের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের সর্ববৃহৎ বন্দর। সব থেকে বেশি রাজস্ব দেয় সরকারকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ছোঁয়া আজও লাগেনি। সেই যে কবে আপনার মাতা বেগম খালেদা জিয়া যা করে গেছেন তারপর একটি ইটও লাগেনি।’
যশোরের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী একটি বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি জানেনÑআমাদের যশোর একটি কৃষি প্রধান এলাকা। এখানে একটি বিশেষায়িত হিমাগারের স্বপ্ন ছিলো আপনার মাতার। আমাদের উৎপাদিত সবজি মৌসুমে দাম পড়ে যায়। কৃষকরা যেন এই বিশেষায়িত হিমাগারে সবজি রাখতে পারে, সারা বছর বিক্রি করে ভালো দাম পাবে ও লাভবান হতে পারে অন্য দিকে বাজারের সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে গ্রাহকেরা কম দামে সারা বছর তরকারি খেতে পারে।’
ঝিকরগাছার গদখালির ফুলচাষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতা হিসেবে যশোরে এসেছিলেন। আপনি তখন বলেছিলেন যশোরের ফুলের শোভা শুধু বাংলাদেশ কেন সারা বিশ্ব গ্রহণ করুক এটা আপনার প্রত্যাশা। তাই যশোরের ঝিকরগাছার গদখালির ফুল বাগানের ফুল চাষিদের ভাগ্য উন্নয়ন নিশ্চয়ই আপনার বিষাদ একটি কর্মপরিকল্পনা রয়ে গেছে।’
সড়ক অবকাঠামোর দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখানে খুলনা মহানগর বিএনপির প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি উপস্থিত। শুনলে জানবেন খুলনা থেকে যশোর আসতে তাদের সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। কারণ সড়ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখানে ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এবং কুষ্টিয়া পর্যন্ত রাস্তার বেহাল দশা। আপনি যে বাসে উলসিতে গেলেন তার ড্রাইভারের কাছে শুনে দেখবেন ঐ ভাঙ্গা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত রাস্তার কি নাজুক অবস্থা!
তিনি বলেন, ‘আমরা যশোরের মানুষ অতিথিপরায়ণ, সৌজন্যবোধে বিশ্বাসী। তাই প্রথম সফরে কোনো দাবি উপস্থাপন না করার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু যশোরের সন্তান হিসেবে মানুষের প্রয়োজন তুলে ধরা আমার দায়িত্ব।’
প্রতিমন্ত্রী যশোরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় একটি সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘এই প্রত্যাশা পূরণের সামর্থ্য সৃষ্টিকর্তা আপনাকে দিয়েছেন—আপনিই পারেন তা বাস্তবায়ন করতে।’
‘নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে নয় যশোরবাসীর অঙ্গীকারকে মূল্যায়ন করা যাবে না। যশোরবাসী রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে। তাই যশোরবাসীর কষ্টের কথা তুলে ধরা। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যাদের নতুন ভবনের প্রয়োজন, শিক্ষক চাই তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি হবে। সেটা হয়তো আপনার শিক্ষামন্ত্রী আসলে বলতে পারতেন। তাই যশোরবাসীর প্রয়োজনীয় চাহিদা বিনয়ের সাথে আমার যশোরের প্রয়োজনে আপনার নিকট তুলে ধরা।’
সমাবেশ শেষে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায়ও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রশংসা শোনা যায়। মণিরামপুর থেকে আসা বিএনপির এক কর্মী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘রীতিমতো জননেতার মত জনগণের দাবি উপস্থাপন করেছেন আমাদের অমিত ভাই। তিনি যে আমাদের দুঃখ, আমাদের কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন তার এই উপস্থাপনায় সেটা প্রমাণিত হয়েছে।’
মুজিব সড়ক দিয়ে তার সাথে হাঁটতে হাঁটতেই বিএনপির কেশবপুরের এক কর্মী সিকান্দার শেখ বলেন, ‘আমাদের নেতা ছিলেন তরিকুল ইসলাম। তার ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরকে হৃদয় দিয়ে ভাবেন, যশোর উন্নয়নের জন্য, যশোরের মানুষকে ভালো রাখার জন্য তিনি যে সব সময় চিন্তা করেন তার প্রমাণ হয়েছে আজকের জনসভায় তার বক্তব্য।’
সব মিলিয়ে, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের এই বক্তব্য যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


























