সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রদ্ধায় স্মরণ আনোয়ার হোসেন

কিংবদন্তিকে হারানোর ১৩ বছর

এম.আর.জে শান্ত

প্রকাশিত: ১৯:১৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিংবদন্তিকে হারানোর ১৩ বছর

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল শিল্পী পরিচয় ছাপিয়ে এক একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। তেমনই এক অবিসংবাদিত ও বিরল কিংবদন্তি ছিলেন ‘মুকুটহীন নবাব’ খ্যাত আনোয়ার হোসেন। যিনি রূপালি পর্দায় চরিত্রকে শুধু রূপায়ণই করতেন না, বরং তাকে জীবন্ত করে তুলতেন দর্শকের হৃদয়ে। ঐতিহাসিক, সামাজিক কিংবা লোককাহিনি— যেকোনো চরিত্রে তার সাবলীল উপস্থিতি বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে অনন্য উচ্চতায়।

১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুরের মুরুলিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় স্কুলজীবনেই, মঞ্চে অভিনয়ের হাত ধরে। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৭ সালে ঢাকায় পা রাখেন চলচ্চিত্রজগতে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে (বীরেন চরিত্রে) অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে।

শুরুর দিকে তাকে নেতিবাচক বা খল চরিত্রে বেশি দেখা গেলেও নিজের অসাধারণ অভিনয়প্রতিভা দিয়ে খুব দ্রুতই পরিচালক ও দর্শকদের মন জয় করে নেন তিনি। ১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত লোকগাথাভিত্তিক ছবি ‘রূপবান’ তাকে ঘরের মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে। আর এর ঠিক দুই বছর পর, অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালিত ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’-য় সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে তার অবিনশ্বর অভিনয় তাকে পৌঁছে দেয় কিংবদন্তির আসনে। তার সেই চরিত্রায়ণ এতটাই জীবন্ত ও প্রভাব বিস্তারকারী ছিল যে, বাস্তব জীবনেও সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবেসে ‘নবাব’ বলেই সম্বোধন করতে শুরু করেন।
দীর্ঘ ৫২ বছরের বর্ণাঢ্য অভিনয়জীবনে প্রায় পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন আনোয়ার হোসেন। কখনও জমিদার, কখনও প্রতিবাদী কৃষক, কখনও আবার সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি— সব রূপেই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘লাঠিয়াল’, ‘দেবদাস’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘দায়ী কে?’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী ও ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রে তার অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায়ের অন্যতম দলিল।

শিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য জীবদ্দশায় বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই মহান অভিনেতা। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘দায়ী কে?’ চলচ্চিত্রে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আরও দুটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। চলচ্চিত্রে তার এই আজীবন সাধনা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে প্রদান করা হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ‘আজীবন সম্মাননা’। এছাড়া বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ১৯৮৮ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। পাশাপাশি বাচসাস ও নিগার পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা তার মুকুটে যুক্ত হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে নাসিমা আনোয়ারের জীবনসঙ্গী এই অভিনেতা চার পুত্র ও এক কন্যার জনক ছিলেন। শুটিং ফ্লোরে সহশিল্পীদের প্রতি তার আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা এবং কাজের প্রতি শৃঙ্খলাবোধের গল্প আজও চলচ্চিত্রাঙ্গনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, ৮১ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান শিল্পী। নশ্বর শরীরের পতন ঘটলেও তার সৃষ্টির কোনো বিনাশ নেই। বাংলা চলচ্চিত্র যতদিন বেঁচে থাকবে, নবাব সিরাজের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, ‘লাঠিয়াল’-এর বলিষ্ঠ উপস্থিতি কিংবা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-র মানবিক চরিত্র হয়ে আনোয়ার হোসেন চিরকাল বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙালির হৃদয়ে।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: