বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর ২০২৬

২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রেস কাউন্সিলের সচিব

প্রশাসন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ নয়, সমন্বয় জরুরি

রানার প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪:৩১, ৭ অক্টোবর ২০২৬

প্রশাসন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ নয়, সমন্বয় জরুরি

কর্মশালায় বক্তব্য রাখছেন প্রেস কাউন্সিল সচিব মো. আবদুস সবুর

প্রশাসন ও গণমাধ্যমের কাজের লক্ষ্য জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। তাই সাংবাদিক ও প্রশাসনের মধ্যে প্রতিপক্ষের সম্পর্ক নয়, বরং পারস্পরিক সমন্বয় থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সচিব (যুগ্মসচিব) মো. আবদুস সবুর।

তিনি বলেন, সাংবাদিকরা যেমন জনগণের স্বার্থে কাজ করেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জনগণের সেবা দিতে দায়িত্ব পালন করেন। কোনো কর্মকর্তা সাংবাদিকের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত আচরণ না করলে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানানো যেতে পারে। একইভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরও আইন ও পেশাগত নীতিমালা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের উদ্যোগে এবং যশোর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব ও অধিকার বিষয়ক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।

আবদুস সবুর বলেন, সরকারি প্রশাসনে বিভিন্ন অর্গান ও ‘রুলস অব বিজনেস’ অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। কেউ এককভাবে দেশ পরিচালনা করেন না। কেউ কাজ করেন, কেউ তদারকি করেন। এখানে ক্যাডার বা নন-ক্যাডার, বিসিএস বা আইসিএস বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো জনগণের স্বার্থে কাজ করা হচ্ছে কি না।

তিনি বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তার নির্দিষ্ট অধিক্ষেত্র রয়েছে। একজন ইউএনও তাঁর উপজেলার বাইরে, ডিসি তাঁর জেলার বাইরে এবং একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর নির্ধারিত অধিক্ষেত্রের বাইরে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। সাংবাদিকদের এসব প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।

কোনো কর্মকর্তা সাংবাদিকের কথা না শুনলে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রেস কাউন্সিলের সচিব বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তারই একটি নির্দিষ্ট ‘লাইন জব’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। প্রয়োজনে বিষয়টি প্রেসক্লাবকেও লিখিতভাবে জানানো যেতে পারে। প্রেসক্লাব সব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে না পারলেও সাংবাদিককে সহযোগিতা করবে।

তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আবদুস সবুর বলেন, কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিককে প্রথমে নিজের পরিচয়পত্র দেখিয়ে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে হবে। এরপর কী তথ্য বা উপাত্ত প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানাতে হবে।

তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তি তথ্যটি দেওয়া সম্ভব কি না তা বিবেচনা করে সাংবাদিককে জবাব দেবেন। তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে কী কারণে দেওয়া যাচ্ছে না, সেটিও জানানো উচিত। তথ্য অধিকার আইনে কোন কোন তথ্য পাওয়া যাবে এবং কোন কোন তথ্য পাওয়া যাবে না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।

শুধু কোনো কর্মকর্তার কাছে গিয়ে তথ্য না পেলেই অভিযোগ বা সংবাদ প্রকাশ করা সমীচীন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্য না পাওয়ার কারণও জানতে হবে। প্রয়োজন হলে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য কমিশনের কাছে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি তুলে ধরে আবদুস সবুর বলেন, কোনো সাংবাদিক সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দুর্নীতি, জালিয়াতি বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখতে পেলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তখন সাংবাদিক অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনবেন।

তিনি বলেন, এতে প্রশাসন ও গণমাধ্যম উভয়ের কাজের পরিবেশ আরও কার্যকর হতে পারে। সাংবাদিকের কাজ শুধু তথ্য প্রকাশ করা নয়, তথ্য যাচাই করা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তা জনগণের সামনে তুলে ধরাও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কপি-পেস্ট সাংবাদিকতার বিষয়ে সতর্ক করে আবদুস সবুর বলেন, একই সংবাদ এক পত্রিকা থেকে আরেক পত্রিকায় হুবহু প্রকাশ করার প্রবণতা থেকে সাংবাদিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজের মেধা, শ্রম ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংবাদ তৈরি করতে হবে। অন্যের মেধা বা লেখা হুবহু কপি করে প্রকাশ করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা কোনো বাধা, প্রতিবন্ধকতা বা আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হলে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল তাঁদের পাশে থাকবে। তবে কোনো সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার দায় প্রেস কাউন্সিল বা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নেবে না। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদপত্র প্রকাশের আইনগত প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের ‘ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) আইন’-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। সংবাদপত্রের মুদ্রাকর ও প্রকাশকের ঘোষণাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

আইনের ৭ ধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবদুস সবুর বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্ধারিত ‘খ’ ফরমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সমক্ষে ঘোষণা দিতে হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঘোষণাপত্র প্রামাণীকরণে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রেস কাউন্সিলের প্রেস আপিল বোর্ডে আবেদন করতে পারেন। আবার ঘোষণাপত্র দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তা প্রামাণীকরণে ব্যর্থ হলেও প্রেস আপিল বোর্ডে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, একই ব্যক্তি দুই পদে দায়িত্ব পালন করলেও দায়িত্বের ধরন অনুযায়ী পদটি বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময় তিনি জেলা প্রশাসক এবং আইন ও বিচারিক বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার রেজাউল করিম, তথ্য অফিসার এলিন সাঈদ, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সহ-সভাপতি আনোয়ারুল কবির নান্টু, সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলাম, সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মবিনুল ইসলাম মবিন, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদ।

কর্মশালায় যশোরের বিভিন্ন উপজেলার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত ৪৫ জন তালিকাভুক্ত সাংবাদিক অংশ নেন। যশোর সদর, চৌগাছা, শার্শা, ঝিকরগাছা, কেশবপুর, মণিরামপুর, অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলার সাংবাদিকরা প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে সাংবাদিকতার পেশাগত মান উন্নয়ন, গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার ও দায়িত্ব, তথ্য অধিকার আইন, সংবাদপত্র প্রকাশের আইনগত প্রক্রিয়া, সাংবাদিক ও প্রশাসনের পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা পরিহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

শেয়ার করুনঃ

শীর্ষ সংবাদ: