ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার তালসার গ্রামের গৃহিনী শম্পা দেবী প্রতিদিন বাড়ির কাজের ফাঁকে তৈরি করেন ৭ থেকে ১০টি পাপোশ। প্রতিটি পাপোশ তৈরি করে তিনি পান ১৪০ থেকে ২০০ টাকা। মাস শেষে তার আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা। এই আয়ই বদলে দিচ্ছে তার সংসারের চিত্র। জলে জন্মানো এক সময়কার ফেলনা কচুরিপানাই উঠেছে তার আয়ের উৎস।
‘আগে আমরা শুধু গৃহিণী ছিলাম। সংসারের প্রয়োজনে স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন নিজের আয় আছে, নিজের খরচ চালাতে পারছি, সংসারেও সহযোগিতা করতে পারছি,’ বলছিলেন শম্পা দেবী।
শুধু শম্পা দেবী নন, একই গ্রামের বিথি দেবী, বিউটি দেবী, বুলবুলি দেবী, শিল্পী দেবী, শেফালী দেবী ও পিংকী দেবীর মতো অনেক নারীও এখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। তারা গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি নিয়মিত পাপোশ তৈরি করে একই পরিমাণ আয় করছেন।
এই উদ্যোগের পেছনের গল্পটিও অনুপ্রেরণার। ঝিনাইদহ জোনের এজিএম আব্দুল হামিদ জানান, তিনি আগে বিডি ক্রিয়েশনে চাকরি করতেন। সেখান থেকে ধারণা নিয়ে ২০২১ সালে নিজের বাড়ি বড় কামারকুন্ড গ্রামে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি শুরু করেন। পরবর্তীতে কাজের সাফল্য দেখে তা বিস্তৃত করা হয়।
বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি স্থানে গ্রুপভিত্তিক এই কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে কোটচাঁদপুরে রয়েছে ৮ থেকে ১০টি গ্রুপ। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০০ নারী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
এই প্রকল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কচুরিপানা, খড় ও খেজুর পাতাÑ যেগুলো আগে অব্যবহৃত পড়ে থাকত। এসব কাঁচামাল সংগ্রহের কাজেও নারীদের যুক্ত করা হয়েছে, যার জন্য আলাদা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ দিয়ে নারীদের দক্ষ করে তোলার পর তাদের বাড়িতে কাঁচামাল পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তৈরি পণ্য সংগ্রহ করে মজুরি প্রদান করা হয়। এরপর পণ্যগুলোকে রপ্তানিযোগ্য করে তোলা হয়।
আব্দুল হামিদ জানান, তাদের তৈরি পণ্য ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বিশ্বের ৮২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে দেশের বাজারে এখনো তাদের কোনো শোরুম নেই।
শম্পা দেবী বলেন, ‘কাজটি খুব কষ্টের নয়। বাড়ির কাজের ফাঁকে সময় বের করলেই করা যায়। আমি চাই আরও নারীরা এই কাজে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হোক।’
স্থানীয় সমাজসেবা কর্মকর্তাও এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কোটচাঁদপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান বলেন, ‘যদি নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে চান, তাহলে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে সুদমুক্ত ঋণের সুযোগ রয়েছে। যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে তাদের সেই সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।’


























