দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে প্রতিনিয়ত শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসছে ল্যাগেজ ভর্তি ভারতীয় পণ্য। এতে ইমিগ্রেশন কাস্টমসে দায়িত্বরতদের ঠিকঠাক ‘ঘুষবাণিজ্য’ হলেও সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। পাশাপশি এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বৈধ আমদানি বাণিজ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইমিগ্রেশন কাস্টমসে দায়িত্বরত কাস্টমস সুপার উদ্ভব চন্দ্র পাল ও কামাল পাশার সরাসরি ল্যাগেজ পার্টি সিন্ডিকেটের সাথে সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যে জড়ানোর ফলে বৈধ পথেই চলছে শুল্ক ফাঁকির কারবার। এতে বেনাপোলের বৈধপথে থাকা আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও স্থানীয় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কাস্টমস কমকর্তাদের ব্যক্তিগত লোভ ও অনিয়মের কারণে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পাসপোর্ট যাত্রীবেশে বৈধ পথে দুই থেকে তিন লাখ টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, কসমেটিকস ও প্রসাধনী সামগ্রী ল্যাগেজ ভর্তি করে দেশে আনছে একটি চক্র। কখনো কখনো তাদের ল্যাগেজে থাকছে ভারতীয় নামকরা ব্রান্ডের মদ। সীমান্ত এলাকার এই কারবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট সদস্যরা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী ও ভারতীয় ব্যক্তিকে নিজেদের খরচে পাসপোর্ট তৈরি করে বিজনেস ভিসার ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে। এরপর ওইসব ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে ওই সিন্ডিকেটের পণ্যভর্তি ল্যাগেজের ‘ক্যারিং ম্যান’ হিসেবে বাহকের কাজ করছেন।
অনুসন্ধানে আরও তথ্য মিলেছে, ল্যাগেজ সিন্ডিকেটের মূল সদস্যরা তাদের ল্যাগেজ পার হওয়ার আগেই ইমিগ্রেশন কাস্টমসে দায়িত্বরত কাস্টমস সুপারের কাছে পাসপোর্টযাত্রী ল্যাগেজ বাহকের ছবি তুলে হোয়াটঅ্যাপে পাঠিয়ে দেয়। এরপর ওই যাত্রী ল্যাগেজ নিয়ে স্ক্যানার মেশিনে চেকআপ ছাড়াই নির্বিঘ্নে পার হয়ে আসেন। ভারতীয় ক্যরিয়ারদের ক্ষেত্রে তারা সকালে ল্যাগেজ নিয়ে বেনাপোলে এসে সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে দিয়ে দুপুরে বা বিকেলে আবার দেশে ফিরে যান। আর বাংলাদেশী ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে দুই-তিন দিন পর একই ক্যারিয়ার আবারও ল্যাগেজ আনতে ভারতে ঢোকেন, এবং পরদিন ল্যাগেজ নিয়ে দেশে ফেরেন।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন কাস্টমস অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানায়, ইতোপূর্বে ল্যাগেজপার্টির সদস্যরা ‘কাস্টমসের নলেজে’ না দিয়েই পণ্যভর্তি ল্যাগেজ নিয়ে দেশে ঢুকতেন। এরপর সেখানে ‘দরকষাকষি’ করে ঘুষ আদায় করতো কাস্টমস। তবে বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের সামনে পড়তো। ফলে ইমিগ্রেশন কাস্টমসে দায়িত্বরত দুইজন সুপার উদ্ভব চন্দ্র পাল ও কামাল পাশা ‘ঘুষবাণিজ্যের’ নতুন পদ্ধতি বের করেন। এরই অংশ হিসেবে- উপর উপর কাস্টমসে নেই কোন ঘুষ বাণিজ্য। সব কিছু দেখানো হচ্ছে ঠিকঠাক। আগেরমতো ল্যাগেজপার্টির কোলাহলও কমেছে। তবে, বাস্তবে এই দুই কর্মকর্তার সাথে আগেভাগেই চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। তাদের চুক্তি অনুযায়ী হোয়াটঅ্যাপে ল্যাগেজবহনকারী যাত্রীর ছবিও আগেভাগেই চলে আসছে। সে মোতাবেক ওইসব যাত্রীদের নির্বিঘ্নে যাতায়াতের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে চলে আসছে ঘুষের টাকা।
বুধবার ‘ল্যাগেজ সিন্ডিকেটে নতুন কাজ করব- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে’ সিন্ডিকেটের একাধিক সদস্যের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা বলেন, ‘বর্তমানে সরাসরি কাস্টমস সুপাররা লাইনে (ঘুষের চুক্তি) আসছে না’। যা হচ্ছে- স্থানীয় রিপন, সেকটর, জসিম, জিয়া ও সোবহানসহ আরও কয়েকজন পাবলিকের মাধ্যমে হচ্ছে। তবে ওই মাধ্যমে কাজ করলে- একটা ল্যাগেজ ও একটা ঘাড়ে থাকা ছোট ব্যাগে মাল আনলে মিনিমাম ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা ও একটু ছোট ল্যাগেজ ও ঘাড়ে থাকা ব্যাগ হলে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। এছাড়াও কাস্টমস গোয়েন্দাদের নামে এক ব্যক্তি জনপ্রতি ৫০০ এবং জনৈক ইমরান বিজিবি ম্যানেজের নামে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা উত্তোলন করছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ল্যাগেজ পার্টির এই সিন্ডিকেটের অধিকাংশের বাড়ি যশোর ও বেনাপোলের বিভিন্ন এলাকায়। আর তাদের ভাড়া করা ক্যারিয়ার আগে বেশি ছিল ভারতীয়। তবে বাংলাদেশী ভিসা পেয়ে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে এসে ফের ওই দিন ফিরে যাওয়া এই ধরণের পাসপোর্ট যাত্রীকে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতাস্থ বাংলাদেশী দূতাবাসে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করায় ভারতীয় ক্যারিংম্যানের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে আগের তুলনায় বেড়েছে বাংলাদেশী ক্যারিংম্যানের সংখ্যা। তারা ল্যাগেজ পার্টি সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় বিভিন্ন উপায়ে বিজনেস ও টুরিস্ট ভিসা নিয়ে এই কারবারে জড়িয়ে পড়ছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের একাধিক ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কাস্টমসের উদ্ধর্তন কর্তৃৃপক্ষ যদি জেনে-বুঝেই দুর্নীতিবাজ কমকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয় তাহলে তো বুঝেই নিতে হবে সরিয়ার মধ্যেই ভুত আছে।’
তাদের মতে, ইমিগ্রেশন কাস্টমসের সুপারের দায়িত্ব থাকা আলোচিত কর্মকর্তা উদ্ভব চন্দ্র পাল কয়েকমাস আগেও বেনাপোল কাস্টমস হাউজের পরীক্ষণ গ্রুপ-৩ এর দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা ছিলেন। সেখানে থাকাকালে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের ফাইল আটকে ঘুষ আদায় ও বড় অংকের ঘুষের বিনিময়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানীর মতো গুরুতর অপকর্মে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছিলো। অভিযোগ ছিলো- ঘুষের টাকা আদায়ের জন্য দুইজন পাবলিক ক্যাশিয়ার নিয়োগের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার। তারপরও এমন দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তকরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে আর্ন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন কাস্টমসে সুপারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ সকল বিষয়ে জানতে বেনাপোল ইমিগ্রেশন কাস্টমসের সুপার উদ্ভব চন্দ্র পালকে ফোন করা হলে তিনি সাংবাদিকের পরিচয় পেয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোনকল কেটে দেন। যদিও কয়েকঘন্টা পর ফের ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
এছাড়াও বেনাপোল ইমিগ্রেশন কাস্টমসের সুপার কামাল পাশাকে মোবাইলে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, ‘পাসপোর্ট যাত্রীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নোম্যান্সল্যান্ডেও রেশনিং করছে বিজিবি সদস্যরা। এছাড়া ল্যাগেজ বা অবৈধ উপায়ে পণ্যের চালান আটক করতে ইতোমধ্যে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সীমান্তে যে কোন চোরাচালান বা শুল্ক ফাকিঁর মতো চক্রের মূল উৎস্য খুঁজে বের করতে নজরদারি করা হচ্ছে।’


























