যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের বারপাড়া গ্রাম। স্থানীয়দের কাছে যা ঠাকুরপাড়া, বারপাড়া কিংবা কুন্দুপাড়া নামেই বেশি পরিচিত। এই গ্রামেই একসময় দাঁড়িয়ে ছিল একটি প্রাচীন জগদ্ধাত্রী মন্দির— যার অস্তিত্ব আজ আর দৃশ্যমান নয়, তবে ইতিহাস ও জনশ্রুতির ভাঁজে ভাঁজে এখনো তার স্মৃতি বহমান।
ঢাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ঢাকুরিয়া–বোয়ালিয়া পাঁকা সড়ক ধরে এগোলে, বারপাড়া মাদ্রাসার প্রায় দেড়শ’ মিটার পশ্চিমে চোখে পড়ে একটি আধুনিক স্থাপনা—বারপাড়া শ্রী শ্রী জগদ্ধাত্রী মন্দির। চকচকে এই মন্দিরের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বহু পুরোনো এক ধর্মীয় স্থাপনার ইতিহাস।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এখানে একসময় একটি প্রাচীন জগদ্ধাত্রী মন্দির ছিল। সেই মন্দিরে কৃষ্ণমূর্তি ও বেণু গোপাল মূর্তির পূজা হতো। সময়ের আবর্তে মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ধর্মীয় চর্চা থেমে থাকেনি। বর্তমানে এখানে বেণু গোপাল মূর্তির পূজা-অর্চনা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য আজ আর অবশিষ্ট নেই। তবে মন্দিরের আশপাশে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা ইট, ভগ্নাংশ ও সাংস্কৃতিক জঞ্জাল দেখে অনুমান করা যায়— এখানে একসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা ছিল। এই ধ্বংসাবশেষই যেন নীরবে সাক্ষ্য দেয় অতীতের ঐতিহ্যের।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে মন্দিরসংলগ্ন মুক্তেশ্বরী নদী থেকে মাটি খননের সময় একটি কৃষ্ণমূর্তি আবিষ্কৃত হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মূর্তিটি হাঁটুর নিচ থেকে ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় মূর্তিটি যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এই আবিষ্কার প্রাচীন জগদ্ধাত্রী মন্দির ও তার ধর্মীয় প্রভাবের ইতিহাসকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
বর্তমানে প্রাচীন মন্দিরের স্থানে পুকুরপাড় ঘেঁষে একটি আধুনিক জগদ্ধাত্রী মন্দির নির্মাণ করেছে মন্দির কমিটি। ফলে স্থাপনাটি তার আদি স্থাপত্যিক স্বরূপ হারিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণযোগ্য প্রত্নস্থল হিসেবে এর যোগ্যতা নষ্ট হলেও ইতিহাসের দিক থেকে এর গুরুত্ব একেবারেই অস্বীকার করা যায় না।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মন্দিরের জমিটি কল্যাণ কুমার কুন্ডু নামে এস.এ. খতিয়ানভুক্ত। এই তথ্যও মন্দিরটির সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুধাবনে সহায়ক।
প্রাচীন জগদ্ধাত্রী মন্দির আজ আর দাঁড়িয়ে নেই, নেই তার কারুকার্যখচিত দেয়াল কিংবা শিখর। তবু ইতিহাসের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে এর ইতিহাস সংরক্ষণ জরুরি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও যে ইতিহাস বেঁচে থাকে— বারপাড়ার জগদ্ধাত্রী মন্দির তারই এক নীরব উদাহরণ।


























